৩০০ চীনা নাগরিকের ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ
৩০০ চীনা নাগরিকের ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার বড় ধরনের ফাঁদ পেতেছিল একটি চীনা প্রতারকচক্র। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন রিসোর্টে অবস্থান নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল অত্যাধুনিক ডিজিটাল ল্যাব।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্তত ৯৪ জন চীনা নাগরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া আরও প্রায় ২৯৫ জন চীনা নাগরিকের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করেছে কক্সবাজার পুলিশ। সব মিলিয়ে চক্রটির সদস্যসংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রিসোর্টের ভেতরে ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও বিপুলসংখ্যক আইফোন ব্যবহার করে চালানো হচ্ছিল প্রতারণার কার্যক্রম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে দেখানো হতো বড় অঙ্কের মুনাফার প্রলোভন। প্রথমে অল্প বিনিয়োগে সামান্য লাভ দেখিয়ে আস্থা অর্জনের পর বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত করাই ছিল তাদের কৌশল।
কক্সবাজারের রামু থানায় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার অভিযোগে মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে পাঁচ চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, গত ২৫ আগস্ট ও ৩ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযানে এক হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, ৪০টি মাউসসহ বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া চীনের দুটি পতাকা, চীনা পুলিশের ব্যাজ ও একটি ডায়েরিও উদ্ধার করা হয়।
রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টে বড় একটি হলরুমজুড়ে তৈরি করা হয়েছিল কম্পিউটার ল্যাব। পাশাপাশি ছয়টি কক্ষ এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যাতে বাইরে থেকে কোনো শব্দ ভেতরে এবং ভেতরের কোনো শব্দ বাইরে না যায়। পুলিশের দাবি, এটিই ছিল চক্রটির অন্যতম প্রধান ডিজিটাল ল্যাব।
পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্য বলছে, রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলাস ছাড়াও উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লুম রিসোর্ট এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি আবাসিক ভবনে বিপুলসংখ্যক চীনা নাগরিক অবস্থান করছিলেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, ‘বাবর আলী’ নামে এক চীনা নাগরিক এসব জায়গা ভাড়া নিয়েছিলেন। পরে জানা যায়, তাঁর প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তাঁর সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন। আর উ ওয়েইপিং নামে আরেক চীনা নাগরিক নিজেকে ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’র মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
পুলিশের দাবি, গত মার্চ থেকেই চীনা নাগরিকদের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে ছিল। প্রথমে তারা নির্মাণকাজে আসা কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলেও পরে রিসোর্টে ডিজিটাল ল্যাব তৈরির বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। এরপর টানা প্রায় ১০ দিন তাদের ওপর নজরদারি চালানো হয়।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান জানান, অভিযানের তথ্য যাতে আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখা হয়েছিল। নজরদারিতে ডিজিটাল ল্যাবের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়।
বিষয়টি চীনা দূতাবাসকেও অবহিত করা হলে দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি দল কক্সবাজারে এসে রিসোর্টগুলো পরিদর্শন করে। সেখানে নিজেদের নাগরিকদের এমন কর্মকাণ্ড দেখে তারা বিস্মিত হন এবং বিষয়টি চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও সম্মতি জানানো হয়।
পুলিশ বলছে, চক্রটি বাংলাদেশি পুঁজিবাজারকেও টার্গেট করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হাজার হাজার মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
চক্রটির কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হতে পারতেন বলে মনে করছে পুলিশ। এরই মধ্যে জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাওয়া গেছে।
এদিকে মামলাটিকে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের একটি দল তদন্তের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ওই দল দ্রুত কক্সবাজারে যাবে বলে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ চীনা নাগরিকের পাশাপাশি আড়াইশ থেকে তিনশ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৯৫ জন চীনা নাগরিকের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করে সেগুলো ব্লক করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার রিসোর্টগুলোকে ব্যবহার করে গড়ে তোলা এই আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার নেটওয়ার্ক নিয়ে তদন্ত আরও বিস্তৃত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।