ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে নবীজি (সা.) কেমন আচরণ করতেন?

২৮ আগস্ট ২০২৬ - ১৬:৪৭ অপরাহ্ণ
 0
ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে নবীজি (সা.) কেমন আচরণ করতেন?

ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে নবীজি (সা.)-এর আচরণ কেমন ছিল

মতপার্থক্য মানুষের জীবনের স্বাভাবিক একটি বিষয়। পরিবার, কর্মক্ষেত্র কিংবা সমাজ—সব জায়গাতেই মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নতা থাকতে পারে। ইসলামও এই মতপার্থক্যকে অস্বীকার করেনি। বরং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে ন্যায়, শালীনতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে আচরণের শিক্ষা দিয়েছে কোরআন ও সুন্নাহ।

বর্তমান সময়ে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতভিন্নতা অনেক সময় অসহিষ্ণুতায় রূপ নেয়। কেউ ভিন্ন মত প্রকাশ করলেই তাকে অপমান, বিদ্রুপ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়। এমনকি ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণেও একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনা দেখা যায়।

অথচ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে অনন্য আদর্শ। তিনি সত্যের ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়, কিন্তু সত্যের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ করতেন প্রজ্ঞা ও সুন্দর পদ্ধতি।

কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কোরো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক কোরো সর্বোত্তম পন্থায়।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫)

অর্থাৎ মতভিন্নতা থাকলেও যুক্তি, দলিল ও দৃঢ়তার পাশাপাশি ভাষায় থাকতে হবে হিকমত, কোমলতা ও শালীনতা।

কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার কোরো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮)

এই আয়াত ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত মতপার্থক্য থাকলেও তার প্রতি অন্যায় করা যাবে না।

মহানবী (সা.)-এর জীবনে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময়ের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইহুদি, খ্রিস্টান, মুশরিক, মুনাফিকসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁর কাছে প্রশ্ন করেছে, আপত্তি জানিয়েছে এবং কখনো কঠোর ভাষায় কথাও বলেছে। কিন্তু পরিস্থিতি ও ব্যক্তির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তিনি প্রজ্ঞার সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

আহলে কিতাবের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও কোরআনে সর্বোত্তম পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আহলে কিতাবের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থা ছাড়া বিতর্ক কোরো না।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৬)

এমনকি ফেরাউনের মতো অত্যাচারী শাসকের কাছেও হজরত মুসা (আ.) ও হজরত হারুন (আ.)-কে কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বোলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৪৪)

এ থেকে বোঝা যায়, কোমলতা মানে নিজের বিশ্বাস বা নীতিতে আপস করা নয়। বরং সত্যের ওপর অটল থেকেও সুন্দর ও শালীন ভাষায় তা তুলে ধরা ইসলামের শিক্ষা।

মহানবী (সা.) কঠোর স্বভাবের মানুষের সঙ্গেও শালীনতা বজায় রাখতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি তার কঠোর স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু লোকটি প্রবেশ করার পর নবীজি (সা.) তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৫৪)

অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘হে আয়েশা! ধীর হও, কোমলতা অবলম্বন কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৫৬)

এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, অন্যের খারাপ আচরণ আমাদের নিজেদের চরিত্র নির্ধারণ করবে না। কাউকে অপছন্দ করা এবং তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।

বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই শিক্ষার প্রয়োজন আরও বেশি। একটি মতামত বা পোস্টকে কেন্দ্র করে মুহূর্তেই শুরু হয় গালাগালি, বিদ্রুপ ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। একপর্যায়ে সামান্য মতপার্থক্যও ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়।

কোরআন মানুষকে একে অপরকে মন্দ নামে ডাকা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)

এ ছাড়া কোরআনে সন্দেহ, গোপন অনুসন্ধান ও গিবত থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)

তাই মতভেদের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের প্রথম দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, অপরের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করা এবং অযথা অপমানজনক ভাষা থেকে বিরত থাকা।

মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন শত্রুতা ও অন্যায়ের কারণ না হয়। সত্যের প্রতি দৃঢ় থাকা, ন্যায়বিচার বজায় রাখা এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে শালীন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করাই নববী আদর্শ।