একটার পর একটা ভূমিকম্প! সত্যিই কি অতিমাত্রায় কাঁপছে পৃথিবী?
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—পৃথিবী কি আগের চেয়ে বেশি কাঁপছে?
গত মাসে ইন্দোনেশিয়া, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার তিনটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এসব ঘটনায় শত শত মানুষ নিহত হন। এর আগে জুন মাসে উত্তর ভেনেজুয়েলায় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।
তবে বিজ্ঞানীদের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে বড় ভূমিকম্পের খবর বেশি শোনা গেলেও পৃথিবী অস্বাভাবিকভাবে বেশি কাঁপছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে বা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প ঘটে। এর বেশির ভাগই এত দুর্বল যে মানুষ তা অনুভবও করতে পারে না।
২০২৬ সালের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বে ৬ বা তার বেশি মাত্রার ৯১টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ মাত্রার বেশি ছিল ১১টি। সংখ্যাটি গত ১০ বছরের গড়ের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও এখনো স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই রয়েছে। চলতি বছরে এখনো ৮ বা ৯ মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হয়নি।
২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ৬ বা তার বেশি মাত্রার ১৩৩টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এ ধরনের ভূমিকম্পের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম, ৯৯টি। আর ২০২১ সালে সবচেয়ে বেশি ১৫৭টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
অর্থাৎ চলতি বছরের পরিসংখ্যানকে এখনো অস্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না।
ভূমিকম্প কতটা প্রাণঘাতী হবে?
একটি ভূমিকম্প কতটা ভয়াবহ হবে, তা শুধু এর মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। ভূমিকম্পটি কোথায় আঘাত করেছে, সেটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিকম্পের গভীরতা, জনবসতিপূর্ণ এলাকার কতটা কাছে এটি আঘাত করেছে, এলাকার মাটির ধরন এবং ভবন ও অবকাঠামো কতটা শক্তিশালী—এসব বিষয় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
এ কারণে গত ১০ বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পগুলোর অনেকগুলোই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প ছিল না। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি বা নিচে ভূমিকম্প আঘাত হানার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানি বেড়েছে।
ভূমিকম্পের কি কোনো মৌসুম আছে?
ভূমিকম্পের কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম নেই। বছরের যেকোনো সময় ভূমিকম্প হতে পারে। দীর্ঘদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করেও এর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমি ধারা পাওয়া যায়নি।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, বিজ্ঞানীরা এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না কখন কোনো বড় ভূমিকম্প আঘাত হানবে। কারণ, ফল্ট লাইনে কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে জমে থাকা টেকটোনিক চাপকে নির্দিষ্ট কোনো বার্ষিক চক্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় না।
বড় ভূমিকম্পের পরও ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। এর পর আফটারশক কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে।
তাই বিজ্ঞানীরা কোনো ভূমিকম্প ঠিক কখন হবে, তা পূর্বাভাস দেওয়ার পরিবর্তে কোনো এলাকায় কয়েক বছরের মধ্যে বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা হিসাব করেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণের নিয়ম তৈরি করা হয়।
কোথায় বেশি হয় ভূমিকম্প?
বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি হলো প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার। পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্প এই অঞ্চলে ঘটে বলে ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়।
পশ্চিম আমেরিকা থেকে রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে জাপান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া। এসব এলাকায় নিয়মিত শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।
এ ছাড়া জাভা থেকে হিমালয়, তুরস্ক ও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত আল্পাইড বলয়েও বড় ভূমিকম্প ঘটে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চলে আঘাত হানে।
ভূমিকম্পের মাত্রা কীভাবে মাপা হয়?
বড় ভূমিকম্পের শক্তি বা মাত্রা নির্ধারণে বর্তমানে মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল ব্যবহার করা হয়। ভূমিকম্পের উৎসস্থল থেকে কত শক্তি নির্গত হয়েছে, সেটির ওপর ভিত্তি করে এর মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
এই স্কেলটি লগারিদমিক। অর্থাৎ মাত্রা এক ধাপ বাড়লে মাটির কম্পনের তীব্রতা প্রায় ১০ গুণ এবং নির্গত শক্তি প্রায় ৩২ গুণ বেড়ে যায়।
৪ মাত্রার ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে হালকা হলেও কিছু ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। ৫ মাত্রায় ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। ৬ মাত্রার ভূমিকম্পকে সাধারণত শক্তিশালী হিসেবে ধরা হয় এবং এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। আর ৮ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
তবে এখানেও শুধু মাত্রা দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা যায় না। ভূমিকম্পের গভীরতা, জনবসতির অবস্থান, মাটির ধরন, ভবনের মান এবং সুনামি বা ভূমিধসের মতো গৌণ দুর্যোগ—সবকিছু মিলেই একটি ভূমিকম্পের ভয়াবহতা নির্ধারিত হয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প
এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল চিলিতে। ১৯৬০ সালের ২২ মে ভালদিভিয়া অঞ্চলে ৯ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে ভয়াবহ সুনামি সৃষ্টি হয়।
১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার প্রিন্স উইলিয়াম সাউন্ড এলাকায় ৯ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটি ইতিহাসে নথিভুক্ত দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্প।
এরপর ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলে ৯ দশমিক ১ থেকে ৯ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর পর ভারত মহাসাগরে ভয়াবহ সুনামি সৃষ্টি হয়। এতে বিভিন্ন দেশে প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার মানুষ নিহত হন।
তাই সাম্প্রতিক সময়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের খবর একের পর এক সামনে এলেও, এখন পর্যন্ত তথ্য বলছে পৃথিবী অস্বাভাবিকভাবে বেশি কাঁপছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে প্রস্তুতি ও সচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।