চীনে এআই নজরদারির শঙ্কা ঝুঁকিতে নাগরিকদের গোপনীয়তা
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে তাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সম্ভব হলেও, যথাযথ তদারকি না থাকলে তা ব্যাপক নজরদারি, বৈষম্য ও তথ্যের অপব্যবহারের কারণ হতে পারে। চীনের এক আইন গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে এসব আশঙ্কা। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের।
গত মাসে ‘জার্নাল অব সিচুয়ান নরমাল ইউনিভার্সিটি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি লিখেছেন সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডক্টরাল গবেষক লিন জিয়ানশিং। তার গবেষণায় বলা হয়েছে, সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থায় বিগ ডেটা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নাগরিকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে পরিমাপযোগ্য স্কোরে রূপান্তর করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তির সম্ভাব্য আচরণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া সম্ভব।
গবেষকের মতে, এআইনির্ভর এ ব্যবস্থা সরকারের ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং জনসেবা প্রদানের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হচ্ছে, স্কোর নির্ধারণে কোন অ্যালগরিদম কাজ করছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম না থাকলে নাগরিকদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও ঋণ পাওয়ায় প্রভাব
গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তির স্কোর তার দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়া কিংবা সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করা হলে এ ব্যবস্থা একপর্যায়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমা ছাড়িয়ে আচরণ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের গুণগত মান, অ্যালগরিদমের নির্ভরযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিনের মতে, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় কঠোর নীতিমালা ও কার্যকর তদারকি না থাকলে নাগরিকদের ডিজিটাল কর্মকাণ্ডের তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়বে।
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা কেমন
চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে নাগরিকদের আচরণ পর্যবেক্ষণ ও স্কোরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের একটি বিস্তৃত কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এ ব্যবস্থার ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
নিবন্ধ অনুযায়ী, চীনের সামাজিক ক্রেডিট ব্যবস্থা একক কোনো কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক নয়। বরং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পরিচালিত একাধিক উদ্যোগ, পরীক্ষামূলক প্রকল্প এবং স্থানীয় মূল্যায়নব্যবস্থার সমন্বয়ে এটি গড়ে উঠেছে।
এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে গুরুতর আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কালো তালিকাভুক্ত করা, আর্থিক ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন শহরের স্থানীয় সরকারের পরিচালিত মূল্যায়ন কার্যক্রম। কিছু স্থানীয় ব্যবস্থায় নাগরিকদের আচরণসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।
সরকারি সেবায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়াচ্ছে চীন
চীনের সরকার সামাজিক শাসনব্যবস্থা ও জনসেবায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিষদের প্রকাশিত একটি কর্মপরিকল্পনায় সরকারি খাতে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর লক্ষ্য হলো মানুষের প্রয়োজন দ্রুত শনাক্ত করা, আগাম সেবার পরিকল্পনা করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রম আরও কার্যকর করা।
এর উদাহরণ হিসেবে চীনের আনহুই প্রদেশের একটি সামাজিক সহায়তা পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর তথ্যভান্ডার তৈরি এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক সেবার কার্যকারিতা বাড়ানো এ প্ল্যাটফর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য।
গবেষক লিন জিয়ানশিংয়ের মতে, সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থা নাগরিকদের প্রয়োজন শনাক্ত করা, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া এবং সরকারি সম্পদ বণ্টনে সহায়তা করতে পারে। তবে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্যের মান নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য অ্যালগরিদম ব্যবহার এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।
গবেষণায় মূলত সতর্ক করা হয়েছে, যথাযথ নীতিমালা ও তদারকি ছাড়া সামাজিক মূল্যায়নব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ালে জনসেবা উন্নত করার প্রযুক্তিই একসময় নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন পর্যবেক্ষণ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।