মাদকের ভয়াবহ ছোবল বেহাল সরকারি হাসপাতাল

২২ অক্টোবর ২০২৬ - ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
 0
মাদকের ভয়াবহ ছোবল বেহাল সরকারি হাসপাতাল

মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ও সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি সেবা ও পরিচ্ছন্নতার অবস্থা দেখতে গত ১৭ অক্টোবর আকস্মিক পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কোয়ার্টার ও ফুটপাতসহ মোট ১৩টি স্থান পরিদর্শন করেন তিনি। নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দেশের মাদক পরিস্থিতি এবং সরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

দেশে মাদকের বিস্তার এখন বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদক। পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ, এলএসডি ও অন্যান্য কৃত্রিম মাদকের বিস্তারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন অভিযানে মাদকসেবীদের আটক করা হলেও মাদক সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত মূল কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় ৫ হাজার ২৮০ জনের ওপর পরিচালিত এক জরিপের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক ব্যবহার করছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোর-কিশোরী রয়েছে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার বাইরে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৪ কোটি ৩৬ লাখ ইয়াবা ও অন্যান্য অ্যামফিটামিন-জাতীয় ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯১ শতাংশ বেশি। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পাচারপথ ব্যবহার করে দেশে মাদক প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। এ অবস্থায় সীমান্তে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে ভেঙে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের সরবরাহ বন্ধ, মূল কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তরুণদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবার মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দুটি সরকারি হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ এবং উন্নতির জন্য সময় বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। হাসপাতালের শৌচাগার, পানির কল, বেসিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধার বেহাল দশা রোগীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক রোগীকে অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম, গজ-ব্যান্ডেজ, গ্লাভস, তুলা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিজেদের অর্থে কিনতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষার খরচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম হলেও সিটি স্ক্যান, এমআরআই ও এন্ডোস্কোপির মতো পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি—দুটিই বাড়ছে।

দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ ওষুধ ও বিভিন্ন পরীক্ষার পেছনে চলে যায়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এ অবস্থায় মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, ওষুধ সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকারি সেবার সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়।