এখন আর প্রেমপত্র আসে না! ডাকঘরে শুধু তালাকনামা
এখন আর প্রেমপত্র আসে না, ডাকঘরে আসছে শুধু তালাকনামা!
একসময় প্রিয়জনের একটি চিঠির অপেক্ষায় দিন গুনতেন মানুষ। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বাড়ির উঠানে ছুটে আসতেন অনেকে। সেই চিঠিতে থাকত ভালোবাসা, আবেগ আর দূরে থাকা মানুষের খবর। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে গেছে চিঠির সেই দিন। মুঠোফোনের যুগে চিঠির জায়গা দখল করেছে ডিজিটাল যোগাযোগ। আর ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ডাকঘরগুলোতে এখন প্রেমপত্রের বদলে বেশি আসছে বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ।
উপজেলার বিভিন্ন শাখা ডাকঘর ঘুরে দেখা গেছে, অনেক অফিসই তালাবদ্ধ। কোথাও ডাকঘর খুঁজে পেতেও পোহাতে হয় ভোগান্তি। ঝোপঝাড় আর আগাছায় ঢেকে আছে কোনো কোনো ডাকঘরের প্রবেশপথ। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকলেও অনেক জায়গায় নিয়মিত সেবা কার্যক্রম নেই।
মাওহা ইউনিয়নের ভূটিয়ারকোনা ডাকঘরটির অবস্থাও এমন। আশপাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদ থাকলেও সেখানে যাওয়ার নির্দিষ্ট রাস্তা নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, পোস্টমাস্টারকে নিয়মিত আসতে দেখেন না তাঁরা। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে কিল্লাতাজপুর, মুখুরিয়া, লামাপাড়া, ভবানীপুর, রামগোপালপুর, পাছারবাজার, শাহগঞ্জ ও বীরআহাম্মদপুরের কয়েকটি ডাকঘরেও।
ডাকঘরের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ কমে যাওয়ায় চিঠির সংখ্যাও নেমেছে তলানিতে। এখন মূলত সরকারি-বেসরকারি নিয়োগপত্র, আদালতের নোটিশ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিঠিই আসে। তবে তালাকনামার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।
পাছার ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মো. আতাউর রহমান জানান, ১৯৯১ সাল থেকে তিনি এই ডাকঘরে দায়িত্ব পালন করছেন। একসময় চিঠি পৌঁছে দিলে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকেও বকশিশ পেতেন। চিঠির অপেক্ষায় থাকতেন প্রাপকরা। কিন্তু মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়ায় সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। তাঁর ভাষ্য, গত মাসে ডাকঘরে ১৪টি তালাকনামা এসেছে, অথচ গত দুই-তিন বছরে কোনো প্রেমপত্র আসেনি।
লামাপাড়া ডাকঘরের পোস্টমাস্টার ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ডাকঘরে দেওয়া ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলো সরবরাহের পরপরই নষ্ট হয়ে যায়। ভবানীপুর ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মহসিন মাহমুদ শাহও জানিয়েছেন, যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে স্বল্প বেতনের মধ্যেও ডাকসেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কর্মীরা। আতাউর রহমান জানান, মাসে তিনি বেতন-ভাতা পান ৪ হাজার ৪৬০ টাকা, পিয়ন পান ৪ হাজার ৩৫৪ টাকা এবং রানার পান ৪ হাজার ১৭৭ টাকা।
গৌরীপুর প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আমিনুল ইসলাম জানান, অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, উপজেলা ডাকঘরের মাসিক অফিস খরচের বরাদ্দ মাত্র ৮০ টাকা। এই অর্থে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক সামগ্রী কেনাও কঠিন। বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সেবার মান ধরে রাখতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১৪টি শাখা ডাকঘর ও উপজেলা ডাকঘর মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০টি তালাকনামা আসে। সেই হিসাবে বছরে এই সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। গত নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো তরুণ-তরুণীর নামে প্রেমপত্র আসতে দেখেননি বলেও জানান তিনি।
একসময় যে ডাকঘর ছিল ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম, সময়ের সঙ্গে সেই ডাকঘরের চিত্র বদলে গেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে হারিয়ে যাচ্ছে চিঠির পুরোনো আবেগ, আর গৌরীপুরের ডাকঘরগুলোতে সেই পরিবর্তনের একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে তালাকনামার হিসাব।