‘বারুদগন্ধ’ দিন ১৯ জুলাই, শতাধিক প্রাণহানির পর কারফিউ দিয়েও দমানো যায়নি আন্দোলন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি ১৯ জুলাই। স্বৈরাচারী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সেদিন ঢাকাসহ সারাদেশে প্রাণ হারান শতাধিক মানুষ। সংঘর্ষ, গুলি, অগ্নিসংযোগ আর আতঙ্কের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়, মাঠে নামানো হয় সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়।
চব্বিশের ১৯ জুলাই— মীর মুগ্ধ নিহত হওয়ার পরদিন আন্দোলনের গতিপথ বেগতিক হয়ে যায়। সেসময় ইন্টারনেট বন্ধ করে ক্ষান্ত হয়নি স্বৈরাচার সরকার। বরং এদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দমন-পীড়নের মাত্রা আরও বাড়ানো হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার সমর্থকদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজধানী ও বিভিন্ন জেলা।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, রামপুরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনভর চলে সংঘর্ষ। গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেডের মধ্যে রাজধানীতেই প্রাণ হারান অন্তত ৪৪ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকার চার বছরের শিশু আহাদ এবং জানালার পাশে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ১১ বছরের শিশু সামি।
রক্তক্ষয়ী এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে সিলেট, নরসিংদী, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, গাজীপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। সিলেটের বন্দরবাজার এলাকায় সংবাদ সংগ্রহকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। পরে ফরেনসিক প্রতিবেদনে তার শরীরে ৯৮টি আঘাতের চিহ্নের তথ্য উঠে আসে।
দিনভর সংঘর্ষে হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ মানুষের ঢল নামে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আহতদের আনা হয়। চিকিৎসক ও নার্সদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। আহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বিভিন্ন বয়সী সাধারণ মানুষও ছিলেন।
দিনটিতে শুধু প্রাণহানিই নয়, রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। বিআরটিএ ভবন, পিবিআই কার্যালয়, রামপুরা থানা, একাধিক পুলিশ বক্স এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনেও ভাঙচুরের পর বন্ধ হয়ে যায় মেট্রোরেল চলাচল। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে পড়ে দূরপাল্লার বাস ও রেল যোগাযোগ, বাতিল হয় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।
এদিন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও র্যাব দাবি করে, তারা কেবল আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও দিনটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের মন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আন্দোলনকারীরা প্রথমে আট দফা, পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াসহ নয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। একই সময়ে আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায় বিএনপি।
অন্যদিকে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার ঘটনায় শত শত বন্দি পালিয়ে যায় এবং অস্ত্র লুটের ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। সেই রাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আটক করা হয়।
তবে মৃত্যুর রেকর্ড গড়া এই রক্তাক্ত দিনও আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি। বরং প্রাণহানি, দমন-পীড়ন ও কারফিউ উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ইতিহাসের পাতায় ১৯ জুলাই স্থান করে নেয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে রক্তাক্ত ও সিদ্ধান্ত নির্ধারণী দিন হিসেবে।