২০ দিনে হামের উপসর্গে ৯৯ শিশুর মৃত্যু, কাল থেকে ১৮ জেলায় বিশেষ টিকাদান
দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। গত ২০ দিনে সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৮১২ জন। সর্বশেষ শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রাত থেকে শনিবার (৪ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি নির্বাচিত উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।
শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানান, রোববার সকাল ৯টা থেকে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেয়া হবে। টিকার পাশাপাশি অসুস্থ শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, একটি শিশুও যেন টিকার আওতার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করা হবে। যারা আগে নিয়মিত কর্মসূচিতে টিকা নিয়েছে, তারাও এই বিশেষ টিকা নিতে পারবে; এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে তিনি দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।
যেসব এলাকায় টিকা দেয়া হবে
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রকোপ বিবেচনায় ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলাকে এই কর্মসূচির জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। জেলাগুলো হলো— বরগুনা (বরগুনা পৌরসভা ও সদর), পাবনা (পাবনা পৌরসভা ও সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, বেড়া), চাঁদপুর (চাঁদপুর পৌরসভা ও সদর, হাইমচর), কক্সবাজার (মহেশখালী, রামু), গাজীপুর (গাজীপুর সদর), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট), নেত্রকোনা (আটপাড়া), ময়মনসিংহ (ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, তারাকান্দা, শ্রীনগর), রাজশাহী (গোদাগাড়ী), বরিশাল (মেহেন্দীগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ), নওগাঁ (পোরশা), যশোর (যশোর পৌরসভা ও সদর), নাটোর (নাটোর সদর), মুন্সীগঞ্জ (মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, লৌহজং), মাদারীপুর (মাদারীপুর পৌরসভা ও সদর), ঢাকা (নবাবগঞ্জ), ঝালকাঠি (নলছিটি), শরীয়তপুর (জাজিরা)।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে সংশ্লিষ্ট সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সবাই হামে আক্রান্ত নয়। আমরা প্রটোকল অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করছি।
শিশু বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত শিশুর জন্মের পর বিসিজি টিকা দেয়া হয়। প্রথম সপ্তাহে একডোজ। ৪ সপ্তাহ পর এক, আরও ৪ সপ্তাহ পর আরেক ডোজ দিতে হয়। ৯ মাস হলেই একডোজ এবং ১৫ মাস হলে হাম ও রোবেলার শেষ ডোজ টিকা দেয়া হয়ে থাকে। এর আগে পলিও, নিউমোনিয়া, টিটেনাস, হোপিংকফ, ডিপথেরিয়া ও হেপাটাইটিসের টিকা প্রদান করা হয়।
গত ২৯ মার্চ বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধশিল্প মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আট বছর আগে হাম টিকা দেয়া হয়েছিল, এরপর আর দেয়া হয়নি।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে শেষবার ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো সরকার এই টিকা দেয়নি। এ কারণে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তবে এ সংকট সমাধানে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে টিকা ক্রয় করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে আছে কোভিড মহামারি-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাত, শহরের বস্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদানে ফারাক।
মাইগ্রেশন ও ‘টিকা না পাওয়া’ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিংয়ের ঘাটতি। এর ফলে একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দ্রুত এবং কার্যকরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বাংলাদেশ প্রধানদের সঙ্গে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের পদক্ষেপগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে। প্রথমত, দ্রুত ভ্যাকসিন সংগ্রহ, দেশে আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিতরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জনমনে অযথা আতঙ্ক কমাতে এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে জাতীয় পর্যায়ে যোগাযোগ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
এছাড়া, দেশের সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য হাম রোগের সন্দেহভাজন রোগীদের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন ও প্রেরণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো বিশেষ করে আইসোলেশন ব্যবস্থা ও চিকিৎসা প্রস্তুতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ মুহূর্তে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণকে আশ্বস্ত করা এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সবার ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশ অতীতেও বড় বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। দৃঢ় নেতৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।