হত্যার পর লাশের ঠিকানা নদী! একটার পর একটা অজ্ঞাত মরদেহ

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০৯:১০ পূর্বাহ্ণ
 0
হত্যার পর লাশের ঠিকানা নদী! একটার পর একটা অজ্ঞাত মরদেহ

হত্যার পর লাশ গুমের নিরাপদ ঠিকানা নদী, মিলছে একের পর এক অজ্ঞাত মরদেহ

রাজধানীর আশপাশের নদী ও খালে একের পর এক অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ। হত্যার পর পরিচয় মুছে ফেলতে নদীতে লাশ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পানিতে দীর্ঘসময় পড়ে থাকায় লাশ পচে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গত বছরের ২৩ আগস্ট বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করেছিল নৌপুলিশ। কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ কোল্ড স্টোরেজ এলাকার তীরে পাওয়া যায় প্রায় ৩০ বছর বয়সী এক নারী ও তিন-চার বছরের এক শিশুর মরদেহ। নারীর গলায় কালো কাপড় এবং শিশুটির শরীরে ওড়না প্যাঁচানো ছিল।

একই সময় কালিন্দীর মাদারীপুর ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও দুই তরুণ-তরুণীর লাশ। তাদের হাত একসঙ্গে বাঁধা ছিল এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে লাশ পচে যাওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। দাবিদার না থাকায় ১১ দিন পর অজ্ঞাত হিসেবেই দাফন করা হয়। কিন্তু এতদিন পরও ওই ঘটনার রহস্যের কোনো সমাধান হয়নি।

এদিকে গত ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আদাবরের হাক্কারপাড়সংলগ্ন খাল থেকে উদ্ধার করা হয় এক কিশোরীর খণ্ডিত মরদেহ। প্রথম দিন একটি ট্রলি ব্যাগ থেকে মাথা, দুই হাত ও শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন কিছুটা দূরে প্লাস্টিকের বস্তায় পাওয়া যায় দুটি পা। এখনো ওই কিশোরীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য কোথাও হত্যার পর লাশ নির্জন এলাকায় নিয়ে নদী বা খালে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। পানিতে পড়ে লাশ দ্রুত পচে যাওয়ায় নষ্ট হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ আলামত। আবার মাছের কামড় কিংবা নৌযানের প্রপেলারের আঘাতে শরীরে নতুন ক্ষত তৈরি হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের আলামত শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

নৌপুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসে নদী থেকে ১৭১টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৩ জনের পরিচয় শনাক্ত হলেও এখনো ৪৮টি লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে উদ্ধার হয়েছে মোট ৩৭৯টি লাশ। আর ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে নদী থেকে উদ্ধার করা হয় ২ হাজার ৬৪টি লাশ।

বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীতে তুলনামূলক বেশি লাশ পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এর মধ্যে নৌকাডুবি, পানিতে নিখোঁজ, গাড়ি নদীতে পড়ে মৃত্যু ছাড়াও হত্যার পর লাশ গুমের ঘটনাও রয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নদীতে হাত-পা বাঁধা, বস্তাবন্দি কিংবা খণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগজনক। গভীর রাতে ব্রিজ কিংবা জনবসতি কম এমন জায়গা থেকে লাশ ফেলা সহজ হওয়ায় অপরাধীরা এসব স্থান বেছে নিতে পারে। এ ধরনের জায়গা চিহ্নিত করে সিসি ক্যামেরা ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নদীপাড়ের এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি।

নৌপুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানান, নদী থেকে কোনো লাশ উদ্ধার হলে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে হত্যা মামলা করা হয়। তবে পচে যাওয়া লাশের পরিচয় ও হত্যার রহস্য উদঘাটন অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও উদ্ধার হওয়া আলামত ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।