হিমালয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শঙ্কা ঝুঁকিতে ৩ লাখের বেশি মানুষ
হিমালয়ে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ৩ লাখ মানুষ
হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে। হিমবাহ গলে সৃষ্টি হওয়া হ্রদের আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও পাহাড়ি ঢলসহ নানা দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন অন্তত তিন লাখ মানুষ। উদ্বেগের বিষয় হলো, ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলাকায় দ্রুত বাড়ছে আবাসন, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে হিমালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। বিশেষ করে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়া কিংবা বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে, এমন এলাকাগুলোতে নির্মাণ বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।
গবেষণায় উত্তর নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত এবং ভারতের উত্তরাখণ্ডের কয়েকটি অঞ্চলকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রিটেন, নেপাল ও ভারতের নয়জন গবেষক হিমালয়ের নদীগুলোর দুই পাশের ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা এবং প্রায় ১ হাজার ৩৬০টি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের আশপাশে এই গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষকদের আশঙ্কা, প্রকৃত ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, গবেষণায় নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আশপাশের একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এর আওতায় আসেনি।
পর্যটন ও অবকাঠামো নির্মাণে বাড়ছে বিপদের আশঙ্কা
নেপালের পর্যটন নগরী পোখারা হিমালয় অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণের অন্যতম উদাহরণ। গত তিন দশকে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরটির আয়তনও বেড়েছে। তবে শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া সেতি গণ্ডকি নদীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ।
পোখারার মেয়র ধনরাজ আচার্য জানিয়েছেন, নদীর তীরে অনেক পুরোনো ভবন রয়েছে, যেগুলো পানির প্রবাহ থেকে মাত্র পাঁচ মিটার দূরে নির্মিত। অথচ নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নদী থেকে আরও দূরে ভবন নির্মাণের কথা। এসব ভবন কীভাবে ও কোথায় সরানো হবে, তা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পোখারার উত্তরে জনপ্রিয় অন্নপূর্ণা ট্রেকিং এলাকাতেও নদীর তীরে বসতি বাড়ছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে এসব এলাকার কয়েকটি বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় হোমস্টে ব্যবসায়ী ফুরপা শিরিং লামা জানান, বছরের এই সময়ে সাধারণত পর্যটকদের ভিড় থাকে। তাঁর ২০টি কক্ষের সবগুলোই অতিথিতে পূর্ণ থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে মাত্র পাঁচটি কক্ষে পর্যটক রয়েছেন। চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করলেও এমন দুর্যোগ আগে দেখেননি বলে জানান তিনি।
মোদি নদীর পাশে হোটেল পরিচালনাকারী কৃষ্ণ গৌচনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, হিমবাহ ভেঙে গেলে কিংবা হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে এলে নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও লিডস ইউনিভার্সিটির হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সি স্কট ওয়াটসন সতর্ক করে বলেছেন, নদী উপত্যকাগুলোতে জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এখন উন্নয়ন নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আগামী কয়েক দশক ধরে দুর্যোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে হিমবাহ-সৃষ্ট বন্যার ঝুঁকি
হিমালয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির তুলনায় হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে। ফলে হিমবাহ, বরফে ঢাকা অঞ্চল এবং পার্বত্য এলাকার স্থায়ী বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে।
এর প্রভাবে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদগুলোতে পানির পরিমাণ বাড়ছে। কোনো একপর্যায়ে এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। নেপালে ১৯৪০ সাল থেকে এ ধরনের প্রায় ৩০টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উঁচু পার্বত্য এলাকাগুলোতেও বৃষ্টিপাত বাড়ছে, যেখানে আগে মূলত তুষারপাত হতো। এতে ভূমিধস, পাথর ও বরফের খণ্ড পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসার আশঙ্কাও বাড়ছে।
গবেষণায় নদী কিংবা হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানির স্তর থেকে ৫০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতা বলছে, বিপদের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। গত ২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যার সময় কোনো কোনো স্থানে নদীর পানি ৭০ মিটার পর্যন্ত উঠে এসেছিল। এতে নদীর তীর থেকে দূরে থাকা ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নির্মাণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগের তাগিদ
হিমালয় অঞ্চলে শুধু পর্যটন অবকাঠামো নয়, ভোটেকোশি ও ত্রিশূলি নদীর আশপাশে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এসব স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বাড়বে।
নেপালের নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সূর্য রাজ আচার্য বলেন, নদীতীরের নিচু ও সমতল জমিতে সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, হোটেল ও বাজার গড়ে উঠেছে। এসব জায়গায় যাতায়াত ও নির্মাণকাজ সহজ হওয়ায় মানুষ সেখানে বসতি স্থাপন করছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাবিধি এবং নদী থেকে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম উপেক্ষা করা হচ্ছে।
ভারতের উত্তরাখণ্ডেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। পরিবেশকর্মী অনুপ নওটিয়ালের অভিযোগ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন ব্যবসার প্রসারের নামে নদীতীরের নির্মাণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
তবে বন্যাপ্রবণ এলাকায় জমির ব্যবহার ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে গত ১২ অক্টোবর নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছে উত্তরাখণ্ড সরকার। বন্যায় মানুষের জীবন, সম্পদ ও জরুরি অবকাঠামো রক্ষা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখাই এর উদ্দেশ্য।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ সংস্থাও ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া-ভোটেকোশি এলাকায় নদীর তীর থেকে ১৫ মিটারের মধ্যে বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্য নদী উপত্যকাগুলোতেও একই ধরনের নিয়ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ধর্ম রাজ উপ্রেতি বলেন, অনেক মানুষের জমি ও সম্পত্তির সঙ্গে আবেগ জড়িয়ে থাকায় তাদের সরিয়ে নেওয়া কঠিন। তবে ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী এলাকাগুলোকে উচ্চ, মাঝারি ও কম ঝুঁকির শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত বিমাব্যবস্থা এবং নিরাপদ স্থানে বসতি স্থাপনে উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
গবেষকদের মতে, হিমালয়ের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে উন্নয়নকাজের জন্য আরও কঠোর পরিকল্পনা ও নির্মাণবিধি প্রয়োজন। শুধু নিয়ম তৈরি করলেই হবে না, সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও সম্পদ হুমকির মুখে পড়তে পারে।