সৌদিকে বাঁচাতে গিয়ে বড় বিপদে মিশর!

২১ অক্টোবর ২০২৬ - ১২:১৩ অপরাহ্ণ
 0
সৌদিকে বাঁচাতে গিয়ে  বড় বিপদে মিশর!

সৌদিকে রক্ষার অঙ্গীকারে বড় ঝুঁকিতে মিশর, ইয়েমেন যুদ্ধে জড়ানোর শঙ্কা

ইয়েমেনের যুদ্ধে সৌদি আরবকে রক্ষার অঙ্গীকার করে বড় ধরনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে মিশর। যুক্তরাষ্ট্র যখন এই সংঘাতে নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততা সীমিত রাখার অবস্থানে রয়েছে, তখন সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কায়রো। তবে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মিশরকে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, সংঘাতের লক্ষ্য কী হবে এবং প্রয়োজনে কীভাবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসবে—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসেনি। মিডল ইস্ট আইয়ের কলামিস্ট শাদি ইবরাহিম তাঁর ‘ইয়েমেন ওয়ার: হোয়াই ইজিপ্টস ভাউ টু ডিফেন্ড সৌদি অ্যারাবিয়া আ রিস্কি গ্যাম্বল’ শীর্ষক নিবন্ধে মিশরের এই অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মিশর যদি সরাসরি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও জ্বালানি অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে সুয়েজ খালের নৌপথ, সুয়েজ-মেডিটেরেনিয়ান পাইপলাইন, জ্বালানি টার্মিনাল এবং সংরক্ষণাগারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। এসব অবকাঠামো শুধু মিশরের সামরিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে। ফলে সংঘাতের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সুয়েজ খালের আয় ক্ষতিগ্রস্ত করতে হুথিদের সরাসরি খালে হামলা চালানোর প্রয়োজন নেই। লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে জাহাজ চলাচলের পথে হুমকি সৃষ্টি করলেই বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ওই রুট এড়িয়ে চলতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, জাহাজগুলোকে দীর্ঘতর বিকল্প পথে যেতে হবে এবং সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যেতে পারে। খালটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও জাহাজের সংখ্যা কমে গেলে মিশরের রাজস্ব আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আরও গুরুতর পরিস্থিতিতে জাহাজ বা সামুদ্রিক অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা হলে নিরাপত্তার স্বার্থে নৌপথে চলাচল বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। তবে এমন হামলা হুথিদের নিশ্চিত পরিকল্পনা—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

গত জুলাইয়ে দামিয়েত্তা বন্দরে ড্রোন হামলায় দুটি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা মিশরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও ওই হামলার জন্য কারা দায়ী, তা স্পষ্ট নয়; তাই ঘটনাটিকে হুথিদের কোনো নির্দিষ্ট বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে এ ঘটনা দেখিয়েছে, মিশরের জলসীমায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি রপ্তানি এবং সামুদ্রিক অবকাঠামোর ওপর আস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিলে এই ঝুঁকি আরও বিস্তৃত হয়ে সুয়েজ-মেডিটেরেনিয়ান পাইপলাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা থেকেও মিশরের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমানবন্দর বিভিন্ন সময় হামলার শিকার হয়েছে। ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য এবং লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা দিলেও সৌদি আরবের অনুরোধ অনুযায়ী সরাসরি হামলায় অংশ নিতে সম্মত হয়নি। ফলে সৌদি আরবকে রক্ষার অঙ্গীকার করার আগে মিশরকে বিবেচনা করতে হবে, দেশটি নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলতে প্রস্তুত।

মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সাম্প্রতিক বক্তব্যেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ২০৩০ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পরিকল্পনা এবং সামরিক একাডেমির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় মিশরের সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে দেশটির জনগণকে আরেকটি বিদেশি সামরিক অঙ্গীকারের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে বলা হলেও এর উদ্দেশ্য, সীমা এবং সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মিশরে জনপরিসরে বিতর্ক ও মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকার কারণে এই স্বচ্ছতার অভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গত ১৭ অক্টোবর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় প্রয়োজন হলে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সংসদের অনুমোদন চান প্রেসিডেন্ট সিসি। এর পরদিন মিশরের জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করে। একই সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর কথাও জানানো হয়। এর আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কায়রো সফর করেছিলেন। তবে এসব ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের লক্ষ্য, সেনা মোতায়েনের সময়সূচি কিংবা ইয়েমেনে মিশরীয় সেনাদের প্রবেশের কথা বলা হয়নি। ফলে শুধু এসব বক্তব্যের ভিত্তিতে মিশর সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

মিশরের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা বা বিদেশে যুদ্ধাভিযানে সেনা মোতায়েনের আগে প্রেসিডেন্টকে জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হয় এবং সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের অনুমোদন নিতে হয়। সংসদ না থাকলে সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্য আর্মড ফোর্সেসের সঙ্গে পরামর্শের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রিসভা ও জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের অনুমোদনের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ দেশটির প্রতিরক্ষানীতি, সামরিক প্রস্তুতি, সশস্ত্র বাহিনীর বাজেট এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রেসিডেন্টের সভাপতিত্বে পরিচালিত এই পরিষদে জ্যেষ্ঠ বেসামরিক কর্মকর্তা, সামরিক কমান্ডার ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানেরা রয়েছেন।

তবে পরিষদের বৈঠক ও আলোচনা গোপনীয় হওয়ায় মিশরের সাধারণ নাগরিকেরা জানতে পারেন না, সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে কী ধরনের মূল্যায়ন হয়েছে। সংঘাতের বিস্তার নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে কি না কিংবা একটি সীমিত প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ কীভাবে বড় সামরিক অভিযানে পরিণত হতে পারে, সেসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর নেই। একইভাবে, মিশরের সংসদকে জনগণের মতামতের সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগও সীমিত। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব থাকায় সংসদের অবস্থান বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের স্বার্থ ও প্রভাবের ভারসাম্যও তুলে ধরতে পারে।

এই বিতর্কে সাধারণ মিশরীয় নাগরিকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, বিদেশে সামরিক অভিযান চালানো হলে এর মানবিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে দেশটির জনগণকেই। অথচ অভিযানের উদ্দেশ্য, সীমা এবং সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তাঁদের মতামত দেওয়ার সুযোগ সীমিত। সৌদি আরবকে সামরিকভাবে রক্ষা করা উচিত কি না, কিংবা এ ধরনের পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা কতটা—এসব বিষয়েও সরকার-সমর্থক রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন বক্তব্যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তবে এসব মতপার্থক্য থেকে মিশরের সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে বিভক্তি রয়েছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

ইয়েমেনে মিশরের অতীত সামরিক হস্তক্ষেপও বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬০-এর দশকে ইয়েমেনে মিশরের সামরিক অভিযান সীমিত সেনা মোতায়েন দিয়ে শুরু হলেও পরে তা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেয়। এতে সামরিক ব্যয় বাড়ে এবং সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো না হলেও সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট না থাকলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত সমাধানে পৌঁছানো কঠিন। তাই সৌদি আরবকে রক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আগে মিশরকে সম্ভাব্য পরিণতি এবং সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে।

এদিকে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে মিশরের সংসদে ভোটাভুটি ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে দেশটির সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও দীর্ঘ হয়েছে। ভোটাভুটি পিছিয়ে যাওয়াকে সামরিক অভিযানের ব্যয় ও ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন মূল্যায়নের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে শুধু এ কারণে জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ বা সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন তৈরি হয়েছে বলে প্রমাণিত হয় না।

আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির বিষয়টিও এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষক শাদি ইবরাহিমের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সংঘাতের ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেও এর সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয়ের বড় অংশ আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর ছেড়ে দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তুরস্ককে এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করতে বলার সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। একই সময়ে ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার প্রস্তাব দিলেও সরাসরি হামলায় অংশ নিতে রাজি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মিশরের সামনে প্রশ্ন উঠছে—যেসব শক্তিশালী অংশীদার নিজেদের ঝুঁকি সীমিত রাখছে, তাদের তুলনায় মিশর কেন নিজের সেনা ও সম্পদকে একই ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে?

সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একইভাবে লোহিত সাগরে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করাও মিশরের নিজস্ব স্বার্থের অংশ। কিন্তু এসব স্বার্থ রক্ষার জন্য ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানো অনিবার্য নয়। এমন অভিযান হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ পূরণ করতে পারে। অন্যদিকে, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি, অভিযানের ব্যয় এবং প্রতিশোধমূলক হামলার বড় বোঝা আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর পড়তে পারে।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বাইরে ছিল মিশর। এখন পৃথকভাবে সৌদি আরবকে রক্ষার অঙ্গীকারের মাধ্যমে দেশটি একই ধরনের সামরিক দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করার পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। মিশর যদি যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়, তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি। বিমানবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্রসহ আকাশপথের হুমকি প্রতিহত করা, নজরদারি চালানো এবং অনুমোদন সাপেক্ষে হামলা পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারে।

কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও হামলা অব্যাহত থাকলে সামরিক কমান্ডাররা আরও বিস্তৃত পরিসরে অভিযান পরিচালনার অনুমতি, উন্নত গোয়েন্দা সহায়তা কিংবা স্থলবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলতে পারেন। তখন শুরুতে সীমিত বলে বিবেচিত সামরিক অভিযান ধীরে ধীরে আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। স্থলবাহিনী বা বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের মতো পদক্ষেপের সম্ভাবনা থাকলেও, মিশর এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে এখনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ইয়েমেনে সামরিক সম্পৃক্ততা বাড়লে মিশরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারও নতুন করে বিবেচনা করতে হবে। ইসরায়েলের সঙ্গে অতীতের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দেশটির সামরিক বাহিনীর জন্য বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে সক্ষমতা ও সম্পদ ব্যয় করা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে সুদান ও আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলের পরিস্থিতিও যখন মিশরের মনোযোগ দাবি করছে, তখন ইয়েমেনে অতিরিক্ত সামরিক সম্পৃক্ততা দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এ ছাড়া কোনো অভিযানকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করলেই যে প্রতিপক্ষ পাল্টা হামলা চালাবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। সৌদি ভূখণ্ডের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা এবং সেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের স্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো—দুটি ভিন্ন ধরনের সামরিক পদক্ষেপ। কিন্তু হুথিরা উভয় পদক্ষেপকেই তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত একই সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলে মিশর নিজের অভিযানের উদ্দেশ্য যেভাবেই ব্যাখ্যা করুক না কেন, প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেশটির থাকবে না।

মিশরের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—নিজ দেশের কাছাকাছি থাকা নিরাপত্তা সংকটগুলোর সমাধান না করে সৌদি আরবকে রক্ষায় এত বড় সামরিক অঙ্গীকারের প্রয়োজন কেন? এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড রেনেসাঁ বাঁধ নিয়ে বিরোধ, সুদানের চলমান যুদ্ধ, ইসরায়েলের ফিলাডেলফি করিডর দখল এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সিনাই উপদ্বীপে স্থানান্তরের আশঙ্কা। প্রতিটি সমস্যার ধরন আলাদা হলেও, এসব ইস্যু মিশরের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, অন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মিশরের অবস্থানের সঙ্গে তার তুলনা করেও প্রশ্ন উঠছে।

তবে এসব বিষয় থেকে মিশরের রাষ্ট্রীয় বা সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিভক্তি রয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সামরিক ব্যয় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন ও মতপার্থক্যের সুযোগ রয়েছে। আর সেই মূল্যায়নের কেন্দ্রেই রয়েছে মিশরের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।

যদি ইয়েমেন সংঘাতের কারণে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে সুয়েজ খাল থেকে মিশরের আয় কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হলে জ্বালানি ও আমদানিপণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ইতিমধ্যেই উচ্চ খাদ্যমূল্যের চাপে থাকা মিশরীয় পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবকে রক্ষার অঙ্গীকার মিশরের জন্য কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশটির অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে শুরুতে বিমান ও নৌবাহিনীর সীমিত ভূমিকা থাকলেও পরিস্থিতির পরিবর্তনে অভিযানের পরিধি বাড়তে পারে। আর সেই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি বিদেশে যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের মাধ্যমে শুরু হলেও এর আর্থিক ও সামাজিক পরিণতি মিশরের সাধারণ মানুষের জীবনেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।