ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর ৫ শতাধিক আফটারশক, নিহত ছাড়াল ১৭০০

৩০ জুন ২০২৬ - ০৬:৫১ পূর্বাহ্ণ
 0
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর ৫ শতাধিক আফটারশক, নিহত ছাড়াল ১৭০০

ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলায় এখন পর্যন্ত ৫০০টির বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। অন্যদিকে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ হাজার ৭০০। জাতিসংঘের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মানুষ আটকে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে বহু দুর্গত এলাকায় সরকারি সহায়তা না পৌঁছানোয় স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকাজ।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গত সপ্তাহের ভয়াবহ দুই দফা ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার বহু এলাকায় এখনও উল্লেখযোগ্য সরকারি সহায়তা পৌঁছেনি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি বন্দরনগরী লা গুয়েরায়। সেখানে মানুষ লোহার রড, হাতুড়ি ও গাঁইতি দিয়ে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে স্বজনদের খুঁজছেন এবং উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে স্থানীয় সময় সোমবার (২৯ জুন) ভোরে একটি আফটারশকে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এতে নতুন কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ভাষায়, এটি ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করলেও জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে সোমবার ভোরে ১০০ ঘণ্টার বেশি সময় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর ২১ বছর বয়সী এক যুবককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

গত বুধবার মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলের লা গুয়েরা প্রদেশে আঘাত হানে। এতে প্রায় ৮০০টি ভবন ধসে পড়ে। এরপর সোমবারের ৪ দশমিক ৬ মাত্রার আফটারশক আবারও লা গুয়েরা ও রাজধানী কারাকাসে অনুভূত হয়।

এছাড়া পার্শ্ববর্তী শহর কাতিয়া লা মারেও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো এখনও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে সরকারি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের দেখা গেলেও ধ্বংসস্তূপে তাদের তেমন উপস্থিতি ছিল না বলে জানিয়েছে বিবিসি।

৩২ বছর বয়সী বিদ্যুৎকর্মী রুবেন রোহাস শুধু গ্লাভস ও নিরাপত্তা হেলমেট পরে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সিভিল প্রোটেকশনের কর্মীরা সাহায্য করতে চেয়েছেন, কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। সরকার সেগুলো দিচ্ছে না। তারাও আমাদের মতো খালি হাতে কাজ করছেন।’

আর এই অবস্থায় লা গুয়েরা শহরে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার খুবই সীমিত। অনেক ভবনের ধ্বংসস্তূপে স্থানীয়রা কয়েক দিন ধরে কাজ করার পর সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছাচ্ছে, ফলে ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে যাচ্ছে।

৩৯ বছর বয়সী ক্যারোলিন জেরপা নিজের বাবা ও ভাইকে ধ্বংসস্তূপের নিচে খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, ‘শুধু একটি গাঁইতি দিয়ে আসলে খুব বেশি কিছু করা যায় না’। তিনি জানান, এখন আর জীবিত উদ্ধারের আশা নেই। বরং পরিবারের সদস্যদের মরদেহ খুঁজে বের করে যথাযথভাবে দাফন করাই তার লক্ষ্য।

১৫ বছর ধরে লা গুয়েরায় বসবাসকারী জুলি মারিন বলেন, এত বড় দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত থাকা কঠিন। তবে সরকারের সাড়া দিতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটও এতে ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ভাগনি ও ভগ্নিপতিকে হারিয়েছি। আমার বিশ্বাস, উদ্ধারকারী দল ও যন্ত্রপাতি যদি আরও আগে আসত, তাহলে অনেক মানুষকে বাঁচানো যেত।’

কারাকাসের পশ্চিমে পাহাড়ি এলাকা এল হুনকিতোতে স্থানীয়রা রয়টার্সকে জানান, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি খুবই কম। কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারাই ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছেন।

৩৩ বছর বয়সী কেইলি ইবারা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার, ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার অপেক্ষায় আছি।’

অবশ্য সোমবার ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ২৫ হাজারের বেশি জরুরি কর্মী, পুলিশ ও সেনাসদস্য কাজ করছেন। ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য একটি কমিশনও গঠন করেছেন তিনি। এর নেতৃত্ব দেবেন তার ভাই ও জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া বক্তব্যে ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, বাসিন্দাদের কারা ঘরে ফিরতে পারবেন, তা নির্ধারণ করবে কমিশন। এদিকে গৃহহীনদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরও তৈরি করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের আবাসিক মানবিক সমন্বয়ক জিয়ানলুকা রাম্পোলা দেল তিনদারো সোমবার জানান, বুধবারের ভূমিকম্পের পর ৫০০টির বেশি আফটারশক হয়েছে। অন্তত ২ হাজার ৫০০ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ধসে পড়েছে পুরোপুরি।

তিনি আরও জানান, উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে ১০ হাজার মরদেহ বহনের ব্যাগ সংগ্রহ করছে জাতিসংঘ। তার মতে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়া প্রায় অনিবার্য। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা আশা করি, মৃতের সংখ্যা এর চেয়ে কম হবে। সে কারণেই এখন উদ্ধার অভিযানেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’

এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার জন্য ৩০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই অর্থ জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, আশ্রয়, সুরক্ষা এবং ত্রাণ পরিবহনে ব্যয় করা হবে।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ফোর্ট লডারডেল বর্তমানে লা গুয়েরা উপকূলে অবস্থান করছে। জাহাজটির নাবিক ও মেরিন সদস্যরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এই এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন।

এছাড়া নেদারল্যান্ডস জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে চীন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।