দুই যুগের অভিশাপ থেকে মুক্তি, এবারই শিরোপা জিতবে ব্রাজিল?
'দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' খ্যাত বিশ্বকাপের মঞ্চে দীর্ঘ ২৪ বছরের এক ‘অভিশপ্ত’ বৃত্ত ভাঙল ব্রাজিল। ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও জয় ছিনিয়ে নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে জাপানের বিপক্ষে ২-১ গোলের এই জয় শুধু তাদের শেষ ষোলোয় জায়গা করে দেয়নি, বরং কার্লো আনচেলত্তির দলের ‘হেক্সা’ মিশনের অদম্য মানসিকতার প্রমাণ দিয়েছে।
ম্যাচের ২৯তম মিনিটে কাইশু সানোর গোলে যখন জাপান এগিয়ে যায়, তখন অনেকেই ২০০৬, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো ব্রাজিলের সেই চিরচেনা বিদায়ের শঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কোচ আনচেলত্তির চতুর কৌশল আর খেলোয়াড়দের দৃঢ়তায় ব্রাজিল ঘুরে দাঁড়ায়। ৫৬ মিনিটে অভিজ্ঞ কাসেমিরোর সমতাসূচক হেডে ম্যাচে ফেরে সেলেসাওরা। এরপর যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির গোলটি পুরো স্টেডিয়ামকে উল্লাসে ভাসিয়ে দেয়।

পরিসংখ্যান বলছে, নকআউট পর্বে ব্রাজিলের সর্বশেষ পিছিয়ে পড়েও জয় এসেছিল ২০০২ সালের ২১ জুন কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে মাইকেল ওয়েন গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে নিলেও প্রথমার্ধের ঠিক আগেই রিভালদো সমতা ফেরান এবং পরে রোনালদিনহোর গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে ব্রাজিল। এরপর বড় কোনো টুর্নামেন্টে এমন প্রত্যাবর্তন ব্রাজিল আর করতে পারেনি।
প্রতিপক্ষ প্রথম গোল করার পর ব্রাজিল ম্যাচ জিতেছে—কেবল এমন ম্যাচগুলোকে ‘ঘুরে দাঁড়ানো’ হিসেব করলে, বিশ্বকাপ ইতিহাসে সেলেসাওরা এর আগে এ পর্যন্ত ১৪ বার এই কীর্তি গড়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকই (৭টি) ঘটেছে গ্রুপ পর্বে। বাকি ৭টি এসেছে প্রথম রাউন্ডের পরে; যদিও তার মধ্যে একটি ছিল ১৯৩৮ সালের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। ফলে, প্রকৃতপক্ষে পরবর্তী রাউন্ডে কোয়ালিফাই করা বা শিরোপা নিশ্চিত করার মতো প্রত্যারবর্তন ছিল ৬টি।

ব্রাজিলের পাঁচটি বিশ্বকাপ শিরোপার মধ্যে দুটিই এসেছে পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে। ১৯৫৮ সালের ফাইনালে খেলা শুরুর মাত্র চার মিনিটেই লিডহোমের গোলে সুইডেন এগিয়ে যায়। তবে ব্রাজিল এর কড়া জবাব দেয় ভাভা, পেলে ও জাগালোর গোলে এবং ৫-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয়। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৬২ সালের ফাইনালে মাসোপুস্ট চেকোস্লোভাকিয়াকে এগিয়ে নিলেও আমারিল্ডো, জিতো এবং ভাভার গোলে ৩-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে ব্রাজিল।
প্রথম প্রত্যাবর্তনগুলো হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। ওইবার কোয়ার্টার ফাইনালের টাইব্রেকার ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে এবং সুইডেনের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। সুইডিশদের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে ছিল তারা। ১৯৭০-এর প্রজন্মও দুটি ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছিল, তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে এবং সেমিফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে। ১৯৮২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও স্কটল্যান্ড প্রথমে গোল করলেও জিকো, সক্রেটিস ও তাদের দলের কাছে পরাজিত হয়।

তাদের পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার পর ব্রাজিল আরও দুটি ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছিল। তবে দুটিই ছিল গ্রুপ পর্বে। তারা ২০০৬ সালে জাপানকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় এবং ২০১৪ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৩-১ ব্যবধানে হারায়। তবে নকআউট পর্বে ২০০২ সালের পর যে তিনবার তারা প্রথম গোলটি হজম করেছিল, তার প্রতিটিতেই তারা পরাজিত হয়। ২০০৬ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে, ২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে ও ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে। এবার দীর্ঘ ২৪ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে হিউস্টনে তৈরি হলো নতুন এক ইতিহাস।
এই জয়ের পর ব্রাজিল এখন প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে আজ রাতে অনুষ্ঠিতব্য আইভরি কোস্ট ও নরওয়ের মধ্যকার ম্যাচের জয়ী দল। জাপানের বিপক্ষে এই কঠিন পরীক্ষার পর ব্রাজিলিয়ান ভক্তরা এখন স্বপ্ন দেখছে ২০০২ সালের সেই গৌরবময় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির।

জাপান অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নিলেও, হিউস্টনের এই রোমাঞ্চকর লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে। ব্রাজিল কি পারবে তাদের এই অপরাজেয় ধারা বজায় রেখে হেক্সা মিশনের স্বপ্ন পূরণ করতে? সেলেসাওদের সেই স্বপ্নযাত্রায় নতুন জ্বালানি জোগাল এই জোয়। ব্রাজিলের ভক্তদের বিশ্বাস, এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ম্যাচ জয় নয়, বরং হেক্সা জয়ের প্রথম পদক্ষেপ।