বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান: নির্বাসন থেকে ক্ষমতার কিনারায়
প্রায় দুই দশকের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। জনমত জরিপের পূর্বাভাস সত্যি হলে, আসন্ন বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী এই নেতার জীবনে এক অভূতপূর্ব ভাগ্যপরিবর্তনের সাক্ষী হবে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানের মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আর তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন এবং ১৯৮১ সালে তাকে হত্যা করা হয়।
এদিকে তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুনভাবে পুনর্গঠন করবেন। এটি এমনভাবে হবে যাতে বিনিয়োগ আসে, কিন্তু দেশ কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে। তার এই নীতি ভারতের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত শেখ হাসিনার বিপরীত।
তিনি আরও বলেছেন, দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হবে, পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খেলনা ও চামড়াজাত পণ্যের মতো খাতগুলোতে উৎসাহ সৃষ্টি করা হবে এবং স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীদের জন্য দুই মেয়াদ বা সর্বোচ্চ ১০ বছরের সীমা নির্ধারণ করা হবে।
ভাবমূর্তি বদলের চেষ্টা
চশমা পরিহিত তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর, ঢাকায়। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ না করে তিনি পরে বস্ত্র ও কৃষিপণ্য খাতে ব্যবসা শুরু করেন।
দেশে ফেরার পর তারেক রহমান নিজেকে হাসিনার অধীনে তার পরিবারের নিপীড়নের ঊর্ধ্বে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে তার মা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিএনপির ভেতরে প্রভাবশালী ও দাপুটে নেতা হিসেবে তার যে ভাবমূর্তি ছিল, তা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সেসময় সরকারি পদে না থাকলেও ‘সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র’ পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেন তিনি।
প্রশ্ন তুলে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিশোধ মানুষকে কী দেয়? প্রতিশোধের কারণে মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়। এতে কোনো ভালো কিছু আসে না। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয় এবং তার অনুপস্থিতিতে তাকে দোষী সাব্যস্তও করা হয়। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। তবে তিনি সব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। শেখ হাসিনার পতনের পর এসব মামলায় খালাস পান তারেক রহমান।
লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি দেখেছেন, কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। এছাড়া দেখেছেন—দলীয় শীর্ষ নেতাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন, আর দলীয় কার্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
দেশে ফেরার পর তার আচরণে এসেছে লক্ষণীয় সংযম। তিনি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য এড়িয়ে সংযম ও সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন, রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়া এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন। এ ধরনের বার্তা নতুন শুরুর প্রত্যাশায় থাকা বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তার ভাবমূর্তি নরম করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে পরিবারের পোষা সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’ও।
বিএনপির ভেতরে তারেক রহমানের নেতৃত্ব এখন সুদৃঢ়। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, প্রার্থী নির্বাচন, কৌশল নির্ধারণ ও জোট আলোচনা সবকিছুই তিনি সরাসরি তদারকি করছেন। একসময় এ কাজগুলো তিনি প্রবাসে বসেই করতেন।
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র চর্চা করলেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি এবং দেশ পুনর্গঠন করতে পারি। গণতন্ত্র থাকলেই জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা হয়। তাই আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে চাই, আমরা আমাদের দেশকে নতুন করে গড়ে পুনর্গঠন করতে চাই।’