ইউনূসের কর মামলার রায় এবার কি খুলবে সব অপকর্মের তদন্ত?

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
 0
ইউনূসের কর মামলার রায় এবার কি খুলবে সব অপকর্মের তদন্ত?

কর মামলার রায়, ইউনূসের শাসনামলের সব সিদ্ধান্ত কি এবার তদন্তের মুখে?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি আয়করের বৈধতা নিয়ে করা পৃথক দুটি রিট খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

রায়ের ফলে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য এনবিআরের নির্ধারিত কর পরিশোধে গ্রামীণ কল্যাণের সামনে আর কোনো আইনগত বাধা থাকল না। রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিকে ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা আয়কর পরিশোধ করতে হবে।

এই রায়কে ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। একই সঙ্গে ইউনূসের শাসনামলে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নতুন করে খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হয়েছে।

বিশেষ করে, প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন, নিবন্ধন, করছাড়সহ নানা সুবিধা পেয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতির বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।

সমালোচকদের প্রশ্ন, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। ফলে বর্তমান সরকারের কাছে এসব সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের করসংক্রান্ত সুবিধা এবং সরকারি শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে ড. ইউনূস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচারসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ড. ইউনূস অর্থপাচার মামলায় খালাস পান। এর আগে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালকদের দেওয়া ছয় মাসের কারাদণ্ডের রায়ও বাতিল করে তাদের খালাস দেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো ধরনের প্রভাব বা ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।

ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। সংবিধান বহাল থাকা অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছিল। এ আদেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সরকারের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।

ফলে ওই সময়ের সিদ্ধান্তগুলো সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছে।

একইভাবে ইউনূস সরকারের সময়ে মব সহিংসতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় হামলা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, কর্মস্থলে প্রবেশে বাধা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছিল। সমালোচকদের দাবি, এসব ঘটনায় সংবিধানের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে শিশুদের হামের টিকা কার্যক্রম নিয়েও ইউনূস সরকারের সময়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। টিকাদান কার্যক্রমে ব্যর্থতা বা অবহেলার কারণে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে আইনগত তদন্তের দাবি রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।

এ ছাড়া ইউনূস সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকার কথাও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে সেগুলো তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

সব মিলিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি আয়কর মামলায় হাইকোর্টের রায় নতুন করে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—ইউনূস সরকারের আমলে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডেরও কি এবার স্বাধীন তদন্ত হবে?

আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা কোনো মানদণ্ড নয়, বরং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই জায়গা থেকেই ইউনূস সরকারের আমলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে।