ইউক্রেনে রাশিয়ার ভয়াবহ হামলা একদিনেই প্রাণ গেল ২০ জনের

৩০ অক্টোবর ২০২৬ - ০৭:২৭ পূর্বাহ্ণ
 0
ইউক্রেনে রাশিয়ার ভয়াবহ হামলা একদিনেই প্রাণ গেল ২০ জনের

কিংবদন্তি অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের মৃত্যু

হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই। ৮৬ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই ব্রিটিশ অভিনেতা। ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ সিরিজে ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড এবং ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রে প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার চরিত্রে অভিনয় করে কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। বিবৃতিতে জানানো হয়, বুধবার নিজ বাড়িতে স্ত্রী সানি ওজেলের পাশে থাকা অবস্থায় মারা যান প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। অ্যালঝেইমারস ডিজিজ ও লুই বডি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর স্বল্প সময়ের অসুস্থতার মধ্য দিয়ে তার মৃত্যু হয়।

ITV News+1

১৯৪০ সালের ১৩ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মিরফিল্ড শহরে জন্মগ্রহণ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে তার শৈশব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তার বাবা মানসিক আঘাতজনিত সমস্যায় ভুগতেন এবং মদ্যপ হয়ে পড়েছিলেন বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন অভিনেতা। ছোটবেলায় মায়ের ওপর বাবার শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। এমনকি মাকে রক্ষা করতে বাবা-মায়ের মাঝখানে দাঁড়ানোর স্মৃতিও পরবর্তী সময়ে তুলে ধরেছিলেন এই অভিনেতা।

শৈশবের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় তার। মাত্র ১২ বছর বয়সে এক শিক্ষকের কাছ থেকে শেক্সপিয়রের নাটক ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’ সম্পর্কে জানার পর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্টুয়ার্টের ভাষায়, অভিনয় তাকে নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি দিত। মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভিনয়জগতে পা রাখেন তিনি। ষাটের দশকে রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মঞ্চনাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন।

তবে দীর্ঘদিনের মঞ্চাভিনেতা প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ টেলিভিশন সিরিজের মাধ্যমে। ১৯৮৭ সালে ৪৭ বছর বয়সে সিরিজটিতে ক্যাপ্টেন জ্যাঁ-লুক পিকার্ড চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। মূল ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের পরবর্তী কাহিনি নিয়ে নির্মিত ধারাবাহিকটি ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত প্রচারিত হয়। সাত মৌসুমে ১৭৬টি পর্বে অভিনয়ের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে সিরিজটির একাধিক চলচ্চিত্রেও একই চরিত্রে দেখা গেছে তাকে।

শুরুতে অবশ্য পিকার্ড চরিত্রে অভিনয় নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন স্টুয়ার্ট। তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও খ্যাতিমান অভিনেতা ইয়ান ম্যাককেলেন তাকে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মঞ্চনাটকেই মনোযোগী থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন তিনি। এরপর ক্যাপ্টেন পিকার্ড চরিত্রটিই হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান পরিচয়। এমনকি ২০২০ সালে শুরু হওয়া ‘স্টার ট্রেক: পিকার্ড’ সিরিজেও একই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

২০২২ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিকার্ড চরিত্রের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছিলেন স্টুয়ার্ট। তিনি জানিয়েছিলেন, সিরিজের সাতটি মৌসুম যত এগিয়েছে, জ্যাঁ-লুক পিকার্ড ও নিজের ব্যক্তিত্বের মধ্যকার পার্থক্য ততই কমে এসেছে। একপর্যায়ে চরিত্রটি কোথায় শেষ হয়েছে আর নিজের সত্তা কোথায় শুরু হয়েছে, তা আলাদা করে বোঝাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।

‘স্টার ট্রেক’-এর পাশাপাশি আরেকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ফ্র্যাঞ্চাইজির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। মার্ভেল কমিকস অবলম্বনে নির্মিত ‘এক্স-মেন’ সিরিজে টেলিপ্যাথিক ক্ষমতাসম্পন্ন মিউট্যান্ট প্রফেসর চার্লস জেভিয়ার বা প্রফেসর এক্স চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘এক্স-মেন’ চলচ্চিত্রের পর সিরিজটির আরও কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেন। এসব চলচ্চিত্রে ম্যাগনেটো চরিত্রে অভিনয় করা বন্ধু ইয়ান ম্যাককেলেনের সঙ্গেও পর্দা ভাগ করেছেন তিনি।

এ ছাড়া ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া মার্ভেল চলচ্চিত্র ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’-এও দেখা গেছে তাকে। সর্বশেষ ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’ চলচ্চিত্রেও তার অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে মার্ভেল স্টুডিওস। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি প্যাট্রিক স্টুয়ার্টকে অনন্য প্রতিভার অধিকারী, উদার সহযোগী এবং প্রকৃত ভদ্রলোক হিসেবে অভিহিত করেছে।

ITV News+1

অভিনয়জীবনের বাইরেও নিজের ব্যক্তিত্ব ও কাজের ধরন নিয়ে খোলামেলা ছিলেন স্টুয়ার্ট। ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্কারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘স্টার ট্রেক’ সিরিজের শুরুর দিকে সহশিল্পীদের নিয়ে একটি বৈঠক করেছিলেন। সেটে যথেষ্ট শৃঙ্খলা বজায় না রাখার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিনি। তখন একজন সহশিল্পী তাকে বলেছিলেন, কাজের পাশাপাশি আনন্দ করাও জরুরি। কিন্তু স্টুয়ার্টের উত্তর ছিল, ‘আমরা এখানে আনন্দ করতে আসিনি।’ পরবর্তী সময়ে সহশিল্পীদের কাছ থেকেই আরও প্রাণবন্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত হতে শিখেছিলেন বলে স্বীকার করেন তিনি।

২০১০ সালে নাট্যকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছ থেকে নাইট উপাধি গ্রহণ করেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। এরপর থেকে তিনি স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট নামে পরিচিত হন। ব্রিটিশ অভিনেতা লরেন্স অলিভিয়ের, জন গিলগুড ও অ্যালেক গিনেসকে নিজের আদর্শ মনে করতেন তিনি। তাদের মতো নাইট উপাধি পাওয়া শিল্পীদের কাতারে নিজের নাম যুক্ত হওয়াকে পেশাগত জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখতেন এই অভিনেতা।

ব্যক্তিজীবনে তিনবার বিয়ে করেছিলেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তার দুই সন্তান রয়েছে। ২০১৩ সালে মার্কিন সংগীতশিল্পী সানি ওজেলকে বিয়ে করেন তিনি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত স্ত্রী সানি ওজেল তার পাশে ছিলেন।

ছয় দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়েছেন প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট। তার মৃত্যুতে হলিউডসহ বিশ্বজুড়ে ভক্ত ও সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।