হীরার নামে প্রতারণা? নকল পাথর চিনতে পারছে না ডায়মন্ড মেশিন!

২৬ আগস্ট ২০২৬ - ০৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
 0
হীরার নামে প্রতারণা? নকল পাথর চিনতে পারছে না ডায়মন্ড মেশিন!

হীরার গয়না কিনছেন, আর দোকানি কলমের মতো একটি যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে বলছেন—‘দেখুন, শব্দ হচ্ছে, বাতি জ্বলছে, এটি আসল হীরা!’ এমন পরীক্ষার ওপর ভরসা করেই অনেক ক্রেতা কিনছেন হীরার নামে বিভিন্ন গয়না। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—সাধারণ ‘ডায়মন্ড টেস্টার পেন’-এ নকল বা হীরাসদৃশ পাথরও আসল হীরা হিসেবে শনাক্ত হতে পারে।

রাজধানীর নিউমার্কেটের একটি জুয়েলারি দোকান থেকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকায় হীরার নাকফুল কিনেছিলেন শারমিন ইসলাম। কেনার সময় দোকানি যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে শব্দ ও আলোর সংকেত দেখিয়ে পাথরটি আসল হীরা বলে নিশ্চিত করেন।

কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই নাকফুলটির উজ্জ্বলতা কমতে শুরু করে এবং সেটি কালচে হয়ে যায়। পরে দোকানে নিয়ে গেলেও গয়নাটি ফেরত নিতে রাজি হননি বিক্রেতা।

শুধু নিউমার্কেট নয়, রাজধানীর নয়াবাজার, মিরপুর, শ্যামলী, গুলশান ও বনানীসহ বিভিন্ন এলাকার জুয়েলারি দোকানে হীরা পরীক্ষার নামে ব্যবহার হচ্ছে ‘ডায়মন্ড সিলেক্টর পেন’। পাথরের ওপর যন্ত্রটি ছোঁয়ানোর পর শব্দ ও বাতি জ্বলে উঠলেই সেটিকে আসল হীরার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে ক্রেতাদের।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ এসব পেন টেস্টার মূলত পাথরের তাপ পরিবাহিতা পরীক্ষা করে। আসল হীরা যেমন দ্রুত তাপ পরিবহন করে, তেমনি মোইসানাইট নামের হীরার মতো দেখতে পাথরও উচ্চমাত্রায় তাপ পরিবহন করতে পারে। ফলে অনেক সাধারণ টেস্টারে মোইসানাইটও ‘ডায়মন্ড’ হিসেবে সংকেত দেয়।

অর্থাৎ, শুধু যন্ত্রে শব্দ হওয়া বা বাতি জ্বলে ওঠা মানেই পাথরটি প্রাকৃতিক হীরা—এমন নিশ্চয়তা নেই।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক দোকানে কম দামের গয়নাকেও পেন টেস্টারের ফল দেখিয়ে আসল হীরা হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্রেতাদের দেওয়া হচ্ছে না স্বীকৃত ও অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেমোলজিক্যাল সনদ।

একাধিক ব্যবসায়ীও জানিয়েছেন, সাধারণ পেন টেস্টারে আসল হীরা ও মোইসানাইট—দুটিই একই ধরনের ইতিবাচক সংকেত দিতে পারে। অথচ এই সীমাবদ্ধতার কথা অনেক সময় ক্রেতাদের জানানো হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল হীরা শনাক্ত করতে উন্নতমানের ডুয়াল টেস্টার, মাইক্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণ এবং পূর্ণাঙ্গ জেমোলজিক্যাল ল্যাব পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কারণ বাজারে প্রাকৃতিক হীরার পাশাপাশি ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড, মোইসানাইট, কিউবিক জিরকোনিয়াসহ বিভিন্ন হীরাসদৃশ পাথর রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মোইসানাইট হীরা নয়, তবে দেখতে অনেকটাই হীরার মতো। সাধারণ ক্রেতার পক্ষে খালি চোখে পার্থক্য বোঝা কঠিন। তাই শুধু দোকানের সাধারণ যন্ত্রের পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে যাচাইযোগ্য পরীক্ষাগারের সনদ নেওয়া জরুরি।

রাজধানীর বাংলামোটরে পরিচালিত একটি জেমোলজিক্যাল ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১৫০ টাকা থেকে পাথর পরীক্ষা করা সম্ভব। সেখানে আধুনিক যন্ত্র, মাইক্রোস্কোপ ও জেমোলজিক্যাল পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাকৃতিক হীরা, ল্যাব-গ্রোন হীরা, মোইসানাইটসহ অন্যান্য পাথরের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, হীরার গয়না কেনার আগে শুধু পেন টেস্টারের শব্দ বা আলো দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। বিক্রয় রসিদে পাথরটি প্রাকৃতিক হীরা, ল্যাব-গ্রোন হীরা নাকি মোইসানাইট—তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। পাশাপাশি স্বীকৃত এবং সম্ভব হলে অনলাইনে যাচাইযোগ্য ল্যাব সার্টিফিকেট নেওয়াও জরুরি।

নইলে হাজার টাকার একটি ছোট যন্ত্রের বাতি জ্বলার সংকেতকেই ‘আসল হীরার প্রমাণ’ ধরে প্রতারিত হতে পারেন সাধারণ ক্রেতারা।