হাওরে নিষেধাজ্ঞা শেষ, জেলেদের মনে কেবলই ক্ষোভ আর হতাশা

২৯ জুন ২০২৬ - ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
 0
হাওরে নিষেধাজ্ঞা শেষ, জেলেদের মনে কেবলই ক্ষোভ আর হতাশা

দীর্ঘ এক মাস পর অবশেষে আজ (২৯ জুন) থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্যভাণ্ডার নেত্রকোণাসহ হাওরাঞ্চলে আবারও শুরু হয়েছে মাছ ধরা। ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিস অ্যাক্ট, ১৯৫০’ অনুযায়ী প্রথমবারের মতো সরকারি গেজেটের মাধ্যমে গত ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত হাওরে মাছ ধরার ওপর মাসব্যাপী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। আজ সকাল থেকেই জেলেরা জাল ও নৌকা নিয়ে হাওরে নেমে পড়েছেন। তবে নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও হাওরপাড়ের প্রান্তিক জেলেদের মনে আনন্দের চেয়ে ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার ছাপই বেশি দেখা যাচ্ছে।

হাওরপাড়ের সাধারণ জেলেদের অভিযোগ, দিনের বেলা প্রশাসনের কিছুটা কড়াকড়ি ও লোকদেখানো অভিযান থাকলেও রাতের আঁধারে প্রভাবশালীরা অবাধে মাছ লুট করেছে। রাতের বেলা প্রশাসনের কোনও তদারকি না থাকার সুযোগে গত এক মাস ধরে প্রভাবশালী চক্র হাওরের বিভিন্ন অংশ থেকে মাছ আহরণ করে বড় ধরনের আর্থিক ফায়দা লুটেছে। দিনের পর দিন চলা এই ‘মহাউৎসবে’র কারণে মা মাছ ও পোনা রক্ষায় সরকারের এই উদ্যোগ কোনও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি, বরং নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে। পেটের দায়ে কোনও সাধারণ জেলে গোপনে মাছ ধরতে বাধ্য হলেও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রান্তিক জেলেরা।

চলতি বছর পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কৃষক ও জেলে পরিবারগুলোর শেষ ভরসা ছিল হাওরের দেশীয় মাছ। কিন্তু প্রথমবারের মতো দেয়া ৩১ দিনের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে চরম বিপাকে পড়েন তারা।

নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়টাতে সরকারি নির্দেশনা মেনে জেলেরা কর্মবিরতিতে থাকলেও, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সিলেটসহ হাওর অধ্যুষিত ৭টি অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোর ভাগ্যে কোনও সরকারি বা বেসরকারি খাদ্য কিংবা আর্থিক সহায়তা জোটেনি।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, শুধু নেত্রকোণা জেলাতেই নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৩৯৩টি। কোনও বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রণোদনা না থাকায় এই এক মাসে হাজার হাজার পরিবারকে ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। অনেক পরিবারে সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ জানান, মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে এবং ছোট মাছগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। অভিযানের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২৫ তারিখ পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৭০০টি চায়না দুয়ারী জাল এবং ২৩৭টি কারেন্ট জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া একটি জালের গুদাম জব্দ করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে ১৫ দিনের জেল এবং ১ মাসে মোট ৫৯ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

জেলেদের প্রণোদনার বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন যে, প্রথমবার হওয়ায় এবার জেলেদের কোনও প্রণোদনা দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে জেলেদের তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে এবং আগামী বছর থেকে তাদের ভিজিএফ বা ভিজিডির আওতায় নিয়ে এসে এককালীন খাদ্য বা অর্থ সহায়তা প্রদানের জোরালো প্রস্তাবনা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আগামীতে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বার্সিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ওয়াহেদুর রহমান মনে করেন, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও খাদ্য সহায়তা ছাড়া শুধু কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাছের প্রজনন রক্ষা করা অসম্ভব।