যুদ্ধ-সংকটে বিশ্ব, স্বস্তিতে নেই কোনো সরকার

২৮ অক্টোবর ২০২৬ - ০৪:০০ পূর্বাহ্ণ
 0
যুদ্ধ-সংকটে বিশ্ব, স্বস্তিতে  নেই কোনো সরকার

দুনিয়ার কোনো সরকারই সুখে নেই, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সাধারণ মানুষ। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকা—বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি জনজীবনকে কঠিন করে তুলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা মিলিয়ে অনেক দেশই এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সংঘাতে দুই দেশের বিপুলসংখ্যক সেনা ও বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবকাঠামো, ব্যাহত হয়েছে উৎপাদন ও বাণিজ্য। ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও আর্থিক সহায়তা এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপের অনেক দেশ আগে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধের পর জ্বালানি সরবরাহের ধরন পরিবর্তন, মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এ অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ববাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির এই অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশেও অনুভূত হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ পরিবারের বাজেটে চাপ তৈরি হয়।

একসময় উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পরিচিত বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান এবং আয়বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ফলে শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হলেও দেশটির ঋণের পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরে বাড়ছে। সরকারি ব্যয়, সুদ পরিশোধ এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকেও সরকারি ঋণ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের সরকারি ঋণও অর্থনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাজেটের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে ঋণ নেওয়া হলেও এর কার্যকর ব্যবহার ও পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়। তবে ঋণের পরিমাণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মোট ঋণ, বৈদেশিক ঋণ, জিডিপির অনুপাতে ঋণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অসন্তোষও বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারের নীতির প্রতি অসন্তুষ্টি থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের ঘটনা ঘটছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখা গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে বিতর্ক চলছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। আন্তর্জাতিক সংঘাত ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা কোনো দেশের একক নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও অভ্যন্তরীণ নীতি, সুশাসন, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে তার প্রভাব কমানোর সুযোগ রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং বিভাজনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ২০ অক্টোবর ফ্লোরিডার একটি আন্তধর্মীয় অনুষ্ঠানে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে হেয় করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি তাঁর মেয়ে চেলসি ক্লিনটনের কোরআন পাঠের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। লেখাটিতে বলা হয়েছে, চেলসি কিশোরী বয়সে পবিত্র কোরআন পড়েছিলেন এবং সুরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষকে পরস্পরকে জানার গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।

সব মিলিয়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বের বহু দেশের মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। কোনো দেশই এসব চ্যালেঞ্জের বাইরে নয়। তবে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হতে পারে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম পথ।