জাপানের সঙ্গে বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা ২ লাখ কর্মসংস্থানের আশা
সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও পরিবহন খাতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের পর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি শক্তিশালী, উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার বহুমুখী সম্পর্ক আরও গভীর করা প্রয়োজন। তাঁর চলমান জাপান সফর দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। আলোচনায় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের সুফল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিকে আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশের জন্য পাঁচ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার, জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এতে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তি খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিক্স, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি মহাকাশ বিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে সংযুক্ত করে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এর পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বা ইপিএ দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়াতে এবং অভিন্ন উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নে একটি মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়েও জাপানের সহযোগিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মিয়ানমারে তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে জাপানের ধারাবাহিক সহযোগিতা কামনা করেন।
বাংলাদেশ ও জাপানের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে ভূমিকা রেখেছিলেন। পরে তাঁর মা প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাপান সফর ও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম উল্লেখ করে তিনি দেশটিকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে জাপানের বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও উদারতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর তাঁর সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, দেশটির সরকার এবং জনগণকে আতিথেয়তা ও বাংলাদেশের প্রতি আস্থার জন্য ধন্যবাদও জানান তিনি।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সরকারি সফরে রয়েছেন তারেক রহমান। সফরের মূল লক্ষ্য দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা ত্বরান্বিত করা। সফরের অংশ হিসেবে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, রেল যোগাযোগ, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে দুই নেতা যৌথ বিবৃতি দেন এবং বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন।