স্পেনের সোনালি প্রত্যাবর্তন, যে পথ মাড়িয়ে ফাইনালে লা রোহারা

১৮ জুলাই ২০২৬ - ০৭:৫২ পূর্বাহ্ণ
 0
স্পেনের সোনালি প্রত্যাবর্তন, যে পথ মাড়িয়ে ফাইনালে লা রোহারা

একটি গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু। এরপর টানা জয়, দাপুটে ফুটবল আর শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্স। শুরুতে কিছুটা হোঁচট খেলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্পেন। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে বলের দখল, পরিকল্পিত আক্রমণ এবং দৃঢ় রক্ষণে নিজেদের অন্যতম সেরা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারের সমন্বয়ে গড়া দলটি সেই প্রত্যাশার প্রতিফলনও দেখিয়েছে মাঠে। মাঝমাঠে রদ্রির নেতৃত্ব, দুই উইংয়ে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের গতি এবং রক্ষণভাগের সংগঠিত পারফরম্যান্স স্পেনকে করেছে আরও পরিণত।

কেপভার্দের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হোঁচট
গ্রুপ এইচে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপভার্দের মুখোমুখি হয় স্পেন। পুরো ম্যাচে বলের দখল ও আক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করলেও গোলের দেখা পায়নি লা রোহা। ম্যাচটি শেষ হয় গোলশূন্য ড্রয়ে।

স্পেন ম্যাচজুড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় বলের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং ২৭টি শট নিয়েছিল। কিন্তু কেপভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার অসাধারণ নৈপুণ্যের সামনে বারবার ব্যর্থ হন স্প্যানিশ ফুটবলাররা। ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক একের পর এক সেভ করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নেন।

দ্বিতীয়ার্ধে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসকে মাঠে নামিয়েও কাঙ্ক্ষিত গোল পায়নি স্পেন। অন্যদিকে, নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এক পয়েন্ট নিয়ে ইতিহাস গড়ে কেপভার্দে।

সৌদি আরবকে উড়িয়ে জয়ে ফেরা
প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে দ্বিতীয় ম্যাচেই দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় স্পেন। আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা।

ম্যাচের ১০ মিনিটেই লামিন ইয়ামালের গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। এরপর মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে ব্যবধান ৩-০ করেন মিকেল ওয়ারজাবাল। দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি ডিফেন্ডার হাসান আল তামবাকতির আত্মঘাতী গোলে জয় আরও বড় হয়।

পুরো ম্যাচেই বলের দখল, পাসিং ও আক্রমণে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল স্পেনের। চার গোলের এই জয় শুধু তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, দলটির আত্মবিশ্বাসও অনেক বাড়িয়ে দেয়।

উরুগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপসেরা
গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে স্পেনের সামনে ছিল দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। নকআউটে যাওয়ার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই ম্যাচে ১-০ গোলের জয় তুলে নেয় স্পেন।

ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন আলেক্স বায়েনা। গোল হজমের পর সমতায় ফেরার চেষ্টা করলেও কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি উরুগুয়ে। ম্যাচের শেষদিকে আগুস্তিন কানোব্বিও লাল কার্ড দেখলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় মার্সেলো বিয়েলসার শিষ্যরা।

এই জয়ের মাধ্যমে গ্রুপ এইচের শীর্ষ দল হিসেবে নকআউট পর্বে ওঠে স্পেন। অন্যদিকে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় উরুগুয়ের।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একচেটিয়া আধিপত্য
প্রথমবারের মতো রাউন্ড অব ৩২-এ স্পেনের প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রিয়া। নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচই সহজ নয়, তবে মাঠের খেলায় সেই বাস্তবতা বোঝার সুযোগই দেয়নি স্পেন।

শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রেখে ছোট ছোট পাস, দ্রুত পজিশন পরিবর্তন এবং দুই প্রান্ত ব্যবহার করে অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়েও স্পেনের ধারাবাহিক আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি অস্ট্রিয়া।

শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের জয় নিয়ে সহজেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় স্পেন। এই ম্যাচের পর থেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে স্প্যানিশদের নাম আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হতে থাকে।

পর্তুগালের বিপক্ষে ধৈর্যের জয়
শেষ ষোলোতে প্রতিপক্ষ ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগাল। ইউরোপীয় দুই পরাশক্তির এই লড়াইয়ে শুরু থেকেই দেখা যায় কৌশলগত ফুটবল। মাঝমাঠের দখল নিয়ে সমানতালে লড়ে দু’দল।

আগের ম্যাচগুলোর মতো এদিন অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক ছিল না স্পেন। বরং ধৈর্য ধরে প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় ছিল তারা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই ম্যাচের একমাত্র গোলটি আদায় করে নেয় লা রোহা।

১-০ গোলের এই জয় শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটই এনে দেয়নি, বড় ম্যাচ কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, সেটিরও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে স্পেন।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা
কোয়ার্টার ফাইনালে অপেক্ষা করছিল আরেক ইউরোপীয় শক্তি বেলজিয়াম। পুরো টুর্নামেন্টে এই ম্যাচেই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে দেখা যায় স্পেনকে।

বেলজিয়ামের দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং শারীরিক ফুটবল বেশ কয়েকবার স্পেনের রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। তবে অভিজ্ঞতার জায়গায় এগিয়ে ছিল লা রোহা।

রদ্রি মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে রাখেন, ডিফেন্ডাররা দারুণ সমন্বয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন। অন্যদিকে সুযোগ পেলেই কার্যকর আক্রমণ চালায় স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডরা।

রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে ২-১ গোলের জয় নিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করে স্পেন। এই ম্যাচের পর ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই বলতে শুরু করেন, স্পেন শুধু দৃষ্টিনন্দন ফুটবলই খেলছে না, কঠিন ম্যাচ জয়ের মানসিক দৃঢ়তাও অর্জন করেছে।

সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে
সেমিফাইনালে স্পেনের সামনে ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। দু’দলের তারকাসমৃদ্ধ লড়াইকে অনেকেই আগাম ফাইনাল বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

ম্যাচের শুরু থেকেই সতর্ক ছিল দু’দল। ফ্রান্স দ্রুত পাল্টা আক্রমণে সুযোগ খুঁজলেও স্পেন নিজেদের পরিচিত বল দখলের ফুটবল খেলেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

রদ্রির নিখুঁত পাসিং, পেদ্রির সৃজনশীলতা এবং লামিন ইয়ামালের গতিময় আক্রমণে প্রথমার্ধেই চাপে পড়ে ফরাসিরা। সেই চাপ থেকেই আসে স্পেনের প্রথম গোল।

গোল হজমের পর আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় ফ্রান্স। কিন্তু স্পেনের রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষকের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্সে বারবার ব্যর্থ হয় তারা। দ্বিতীয়ার্ধে পাল্টা আক্রমণ থেকে আরেকটি গোল করে ম্যাচের ভাগ্য প্রায় নিশ্চিত করে দেয় স্পেন।

শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয়ে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে লা রোহা।

কৌশলে সফল দে লা ফুয়েন্তে
স্পেনের এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ঐতিহ্যবাহী টিকি-টাকা দর্শন ধরে রেখেও আধুনিক ফুটবলের গতি ও বৈচিত্র্য যোগ করেছেন তিনি।

প্রতিপক্ষভেদে কৌশল বদলাতে দ্বিধা করেননি এই স্প্যানিশ কোচ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ফুটবল, পর্তুগালের বিপক্ষে ধৈর্য, বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা প্রতিটি ম্যাচেই তার কৌশল কার্যকর হয়েছে।

তরুণদের কাঁধে নতুন স্পেন
পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল তরুণ ফুটবলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। ডান প্রান্তে লামিন ইয়ামাল নিজের গতি, ড্রিবলিং ও সুযোগ তৈরির দক্ষতায় প্রতিপক্ষের রক্ষণে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন। অন্যদিকে বাম প্রান্তে নিকো উইলিয়ামস সমান কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন।

মাঝমাঠে পেদ্রির সৃজনশীলতা এবং রদ্রির নেতৃত্ব স্পেনকে দিয়েছে ভারসাম্য। আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে সংযোগ গড়ে তুলে পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই দলের ছন্দ ধরে রেখেছেন রদ্রি।

শক্তিশালী রক্ষণও সাফল্যের চাবিকাঠি
শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণভাগেও ছিল স্পেনের ধারাবাহিকতা। নকআউট পর্বে খুব কম গোল হজম করেছে দলটি।

ডিফেন্ডারদের সমন্বিত পারফরম্যান্স, সময়মতো ট্যাকল এবং গোলরক্ষকের নির্ভরযোগ্য উপস্থিতি প্রতিটি ম্যাচেই বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে স্পেনকে। বিশেষ করে ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী আক্রমণভাগের বিপক্ষে ক্লিন শিট ধরে রাখা ছিল তাদের রক্ষণশক্তির বড় প্রমাণ।

সামনে আর্জেন্টিনা
এবার ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একদিকে অভিজ্ঞতার শক্তি, অন্যদিকে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস এই দুই দর্শনের লড়াই দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ১৬ বছর ট্রফির অপেক্ষায় থাকা স্পেন এখন আর মাত্র এক ম্যাচ দূরে। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন দেখছে লা রোহা।