ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে আর্জেন্টিনা, মেসিদের ফাইনালে ওঠার পুরো গল্প

১৮ জুলাই ২০২৬ - ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ
 0
ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে আর্জেন্টিনা, মেসিদের ফাইনালে ওঠার পুরো গল্প

বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখা কখনোই সহজ নয়। প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের বাড়তি উদ্দীপনা, সমর্থকদের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা এবং নিজেদের সেরাটা ধরে রাখার চাপ সব মিলিয়ে এটি এক কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু সেই পরীক্ষায় ধাপে ধাপে উত্তীর্ণ হয়েই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। 

২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে এই প্রজন্মের সোনালি অধ্যায় হয়তো শেষের পথে। কিন্তু চার বছর পর উত্তর আমেরিকার মাটিতে আবারও প্রমাণ করল লিওনেল স্কালোনির দল তারা এখনও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিণত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং মানসিকভাবে শক্তিশালী দলগুলোর একটি।

চলতি বছর মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথ মোটেও সহজ ছিল না। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে সেমিফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ। কখনও নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, কখনও অতিরিক্ত সময়ের লড়াই, আবার কখনও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব সবকিছুর সমন্বয়ে ফাইনালে উঠেছে আলবিসেলেস্তেরা।

শুরু থেকেই চ্যাম্পিয়নের আত্মবিশ্বাস
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই অন্যতম ফেবারিট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল আর্জেন্টিনা। কারণ দলটির মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন ছিল। স্কালোনির অধীনে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা দলগত বোঝাপড়া, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণে গতিশীলতা তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

গ্রুপ ‘জে’তে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের বিপক্ষে তিন ম্যাচেই জয় পায় আর্জেন্টিনা। তিন ম্যাচে তারা শুধু পূর্ণ ৯ পয়েন্টই অর্জন করেনি, বরং প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণ করেছে। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে দুর্দান্ত সূচনা করে তারা। এরপর অস্ট্রিয়াকে ২-০ এবং শেষ ম্যাচে জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে নকআউটে ওঠে।

এই তিন ম্যাচে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে আর্জেন্টিনার বল দখলের ক্ষমতা এবং আক্রমণ থেকে রক্ষণে দ্রুত রূপান্তর। লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও লাউতারো মার্টিনেজদের সমন্বিত পারফরম্যান্স দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ধাক্কা
গ্রুপ পর্বের পর নকআউটে প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল কেপ ভার্দে। কাগজে-কলমে শক্তির পার্থক্য থাকলেও মাঠে ম্যাচটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আফ্রিকার দলটি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে দু’দল সমতায় থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেই চ্যাম্পিয়নের অভিজ্ঞতা কথা বলে। অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোল করে ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে স্কালোনির দল।

এই ম্যাচ আর্জেন্টিনাকে বুঝিয়ে দেয়, বিশ্বকাপের নকআউটে কোনো প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।

মিশরের বিপক্ষে প্রত্যাবর্তনের গল্প
শেষ ষোলোতে অপেক্ষা করছিল মিশর। আফ্রিকার দলটি সংগঠিত রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের জন্য পরিচিত। ম্যাচেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।

একাধিকবার পিছিয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হলেও আর্জেন্টিনা হাল ছাড়েনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় তারা। ইনজুরি সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের গোল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে।

এই ম্যাচ ছিল আর্জেন্টিনার মানসিক দৃঢ়তার বড় পরীক্ষা। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত যে দল লড়াই ছাড়ে না, সেই পরিচয়ই আবারও তুলে ধরে তারা।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সবচেয়ে কঠিন লড়াই
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। ম্যাচের শুরুতেই অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দান এনদোয়ের গোলে সমতা ফেরায় সুইসরা। এরপর ম্যাচের গতি আরও বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে সুইজারল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হলেও নির্ধারিত সময়ে জয় পায়নি আর্জেন্টিনা।

অতিরিক্ত সময়ের ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের অসাধারণ দূরপাল্লার শট আর্জেন্টিনাকে আবারও এগিয়ে দেয়। এরপর শেষ মুহূর্তে লাউতারো মার্টিনেজ গোল করে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন।

ম্যাচ শেষে কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, কষ্ট সহ্য করে জয় ছিনিয়ে আনা আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিরই অংশ। তার মতে, এই মানসিক শক্তিই দলকে বারবার কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের করে এনেছে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের মহারণ
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া মানেই বাড়তি উত্তেজনা। ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মর্যাদা সব মিলিয়ে এটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ।

ইংল্যান্ড শুরু থেকেই উচ্চগতির ফুটবল খেললেও আর্জেন্টিনা নিজেদের পরিকল্পনা থেকে একচুলও সরে যায়নি। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ধীরে ধীরে ম্যাচ নিজেদের দিকে টেনে নেয় স্কালোনির শিষ্যরা।

শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। পরে বিশ্লেষণে উঠে আসে, পুরো টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম তাদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শক্তির সুষম ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ছন্দ ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

স্কালোনির কৌশল, মেসির নেতৃত্ব
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা লিওনেল স্কালোনির। তিনি প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষ অনুযায়ী কৌশল বদলেছেন। কখনও আক্রমণাত্মক, কখনও ধৈর্যশীল, আবার কখনও রক্ষণভিত্তিক ফুটবল খেলিয়ে সাফল্য পেয়েছেন।

অন্যদিকে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, নেতৃত্ব দিয়েও দলকে অনুপ্রাণিত করেছেন। ফাইনালের আগে তিনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের সর্বস্ব দিয়ে লড়ব।’ এই বক্তব্যই পুরো দলের মানসিকতার প্রতিফলন।

সামনে শেষ পরীক্ষা
সব বাধা পেরিয়ে এখন আর্জেন্টিনার সামনে একটিই লক্ষ্য বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখা। ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্পেন। ইউরোপের এই দলটি টুর্নামেন্টজুড়ে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে এবং টানা দীর্ঘ সময় অপরাজিত থেকেছে। ফলে ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন আধুনিক ফুটবলের দুই ভিন্ন দর্শনের এক মহারণ দেখার জন্য।

যদি আর্জেন্টিনা এই ম্যাচ জিততে পারে, তবে ব্রাজিল ও ইতালির পর তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়বে। আর যদি এটিই লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ হয়, তবে সেই বিদায় হতে পারে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় সমাপ্তি।