হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে না যে তিন কারণে
হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক হয়নি। সমুদ্রে শত শত জাহাজ অপেক্ষায় থাকলেও এখন পর্যন্ত খুব কম সংখ্যক জাহাজই প্রণালি পেরিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিনটি বড় কারণে এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি হরমুজ প্রণালি।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি ‘খুলে দেয়ার’ কথা জানান। তবে বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চুক্তির ঘোষণা দেয়ার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে মাত্র সাতটি জাহাজ চলাচল করেছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে অপেক্ষমাণ রয়েছে প্রায় ৫৮০টি জাহাজ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় জাহাজ চলাচল ফিরতে এখনও বড় তিনটি বাধা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে— নিরাপত্তা, সমুদ্রে পেতে রাখা মাইন এবং সম্ভাব্য টোল বা ফি।
মঙ্গলবারের মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলে ২৫০টির বেশি তেলবাহী ট্যাংকার এবং ৩৩০টির বেশি কার্গো জাহাজ অবস্থান করছে। তথ্য বলছে, ট্যাংকারগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশই স্থির অবস্থায় রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনালের কাছে অনেক জাহাজ জড়ো হয়ে আছে।
তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক জাহাজ তাদের অবস্থান সামনে আনছে না, ফলে সেগুলো মেরিনট্রাফিকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্যিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক নবীন দাস বলেন, ‘প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল শুরু হলে প্রথমেই উপসাগরে আটকে থাকা জাহাজগুলোর বড় একটি বহর বেরিয়ে যেতে দেখা যেত’। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না।
১. নিরাপত্তা ও সুরক্ষা
সংকট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপের মার্টিন কেলি বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে হলে একজন ক্যাপ্টেনকে অত্যন্ত সাহসী হতে হবে।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় এবং এরপর থেকে অনুমতি ছাড়া পার হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজগুলোর ওপর গুলি চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। অন্যদিকে ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নিজস্ব নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে তারা ‘নির্দেশনা না মানা’ ৯টি জাহাজকে অচল করে দেয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, কিছু জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করা হয়।
রোববার ট্রাম্প অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও পরে বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বহাল থাকবে। আর সেই হিসেবে ১৫ জুনের স্যাটেলাইট চিত্রে ওমান উপসাগরের প্রবেশমুখে মার্কিন অবরোধ রেখার কাছে চারটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তির ঘোষণার পর জাহাজের মালিক, ক্যাপ্টেন ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে কেউই প্রথম ঝুঁকি নিতে চাইছে না। নবীন দাস বলেন, ‘এখনও সবাই অপেক্ষা করে দেখার নীতিতে আছে। কেউই প্রথম হয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না।’
তার ভাষায়, ‘কিছু গ্রিক কোম্পানির মতো তুলনামূলক ঝুঁকি নিতে আগ্রহী মালিকরা যদি সফলভাবে যাতায়াত শুরু করতে পারেন, তাহলে অন্যদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হতে পারে।’
উইন্ডওয়ার্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্সের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মিশেল উইজে বকম্যান বলেন, এপ্রিলের শুরুর ঘটনার কথা অনেক ক্যাপ্টেনেরই মনে আছে। তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণালি পুরোপুরি খোলা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র এক দিন পর ইরানি কর্তৃপক্ষ আবার এটি বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে ৩৩টির বেশি জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হয় এবং কয়েকটি জাহাজের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগও ওঠে।
মার্টিন কেলি বলেন, ‘পরিস্থিতি আসলে কোথায় যাচ্ছে, তা বুঝতে আমাদের আরও কয়েক দিন, হয়তো শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
২. সমুদ্র মাইনের হুমকি
যুদ্ধের শুরুতেই ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, তাদের উপকূল বা দ্বীপে হামলা হলে উপসাগরে ভাসমান মাইনসহ বিভিন্ন ধরনের নৌ-মাইন পেতে দেয়া হবে। আধা-সরকারি বার্তাসংস্থা ফার্স এ তথ্য জানিয়েছিল। এরপর যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র এবং ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার উভয়ই সম্ভাব্য মাইন হিসেবে সন্দেহভাজন ভাসমান বস্তুর বিষয়ে সতর্কতা জারি করে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও সিনেট কমিটিকে বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালির বড় অংশে মাইন পেতে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ বলেন, স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই এসব মাইন অপসারণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পুরো এলাকা মাইনমুক্ত করতে ৩০ দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট ট্যাংকার ওনার্সের ফিলিপ বেলচার বলেন, ‘আমরা আসলে জানি না পরিস্থিতি কী। এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওমানের কাছের দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট তুলনামূলকভাবে মাইনমুক্ত। তাই মূল নৌপথেই মাইন অপসারণ অভিযান বেশি গুরুত্ব পাবে। মার্টিন কেলি বলেন, ‘জরিপ পরিচালনার জন্য তাদের খুব ধীরগতিতে, সম্ভবত দুই থেকে তিন নট গতিতে চলতে হবে।’
মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলোকে এমন একটি চ্যানেল তৈরি করতে হবে, যাতে একই সময়ে জাহাজ প্রবেশ ও বের হতে পারে। সম্ভাব্য মাইন অপসারণ অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠিয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মঙ্গলবার বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে যুক্তরাজ্য তার ‘পূর্ণ ভূমিকা’ পালন করবে। মাইন শনাক্তকরণ সরঞ্জামযুক্ত ব্রিটিশ নৌ-সহায়ক জাহাজ আরএফএ লাইম বে-কে সাইপ্রাসের আরএএফ আক্রোতিরি ঘাঁটির কাছে দেখা গেছে।
৩. টোল বা ফি
ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার মধ্যে থাকা একটি নৌপথ হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে কোনও অর্থ দিতে হতো না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশনের সদস্য নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এই প্রণালিতে অবাধ যাতায়াতের অধিকার সবার রয়েছে।
অন্যদিকে পানামা ও সুয়েজ খালের মতো কিছু কৃত্রিম নৌপথ নির্দিষ্ট সেবার জন্য টোল বা ফি আদায় করে। সংঘাত চলাকালে ইরান ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সংস্থা গঠন করে। তাদের দাবি, তারা নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতিপত্র ব্যবস্থাপনা করবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলো বারবার ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে। রোববার চুক্তির ঘোষণা দেয়ার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি ‘টোলমুক্ত’ থাকবে।
কিন্তু ফার্স বার্তাসংস্থা জানিয়েছে, নতুন চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরান প্রণালিটি পরিচালনা করবে এবং জাহাজ চলাচলের জন্য সম্ভাব্য ‘সেবা ফি’ আরোপ করতে পারে। তবে এই ফি কোন সেবার জন্য নেয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়।
নবীন দাস বলেন, নতুন কোনও অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা চালু হলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং প্রতিদিন কত জাহাজ চলাচল করতে পারবে, তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ‘কে এটি বাস্তবায়ন করবে? কীভাবে করবে? ফি কীভাবে আদায় হবে? উপসাগরীয় অন্য দেশগুলো এ বিষয়ে কী ভাবছে?’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর পাওয়া যেতে পারে। তবে সংঘাত শুরুর আগে যেভাবে অবাধে জাহাজ চলাচল করত, তেহরান আবার সেই অবস্থায় ফিরতে দেবে— এমন সম্ভাবনা কম।
ক্লেপলারের দিমিত্রিস আমপাৎজিদিস বলেন, ‘রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার দিক থেকে প্রণালি দ্রুত খুলে যেতে পারে। কিন্তু বাণিজ্যিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।’