বিশ্বকাপের ট্রফি উঠছে ফ্রান্সের হাতে, বড় ফ্লপ হবে ব্রাজিল!

৮ জুন ২০২৬ - ০৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ
 0
বিশ্বকাপের ট্রফি উঠছে ফ্রান্সের হাতে, বড় ফ্লপ হবে ব্রাজিল!

বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান যুদ্ধ, জ্বালানি সঙ্কটের ধাক্কা আর দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ে দিনরাত জটিল সমীকরণ মেলানো অর্থনীতিবিদরা এবার সাময়িক ছুটি নিয়েছেন তাদের চেনা ছক থেকে। তবে, সামষ্টিক অর্থনীতির সেই খটমটে দুনিয়া ছেড়ে তাঁরা এবার মাথা গলিয়েছেন ফুটবল বিশ্বকাপের চুলচেরা বিশ্লেষণে।

রয়টার্সের এক বিশেষ জরিপে বিশ্বের প্রায় প্রতি মহাদেশের ১৬০ জন অর্থনীতিবিদ অংশ নিয়ে জানিয়েছেন, ১৯ জুলাই ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে ফুটবলের শ্রেষ্ঠতম মুকুট অর্থাৎ বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরবে ফ্রান্স। আর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবার টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ‘ফ্লপ’ বা হতাশাজনক দল হতে যাচ্ছে।

FranceFootball Team
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারই প্রথম ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে ১০৪ ম্যাচের এক বিশাল বিশ্বকাপ দেখছে বিশ্ব। ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম এই মহাযজ্ঞ নিয়ে গত ১১ মে থেকে ৫ জুনের মধ্যে পরিচালিত এই পোল বা জরিপে ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়ে শীর্ষ পছন্দের তালিকায় রয়েছে ‘লে ব্লুজ’ বা ফ্রান্স।

তাদের ঠিক পেছনেই ৩১ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় ফেভারিট হিসেবে রয়েছে স্পেন, যা জনপ্রিয় বেটিং প্ল্যাটফর্ম পলি-মার্কেটের পূর্বাভাসের সাথেও মিলে যায়।

ফ্রান্স যদি সত্যিই শিরোপা জেতে, তবে কোচ দিদিয়ের দেশম ১৯৩৮ সালে ইতালির ভিত্তোরিও পোজোর পর ইতিহাসের দ্বিতীয় কোচ হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়বেন; এবং ১৯৯৮ সালে খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার পর কোচ হিসেবে এই ডাবল সম্পন্ন করার একমাত্র রেকর্ডটি হবে তাঁরই।

এই তালিকায় সেরা পাঁচের বাকি তিন দল হলো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল এবং ইংল্যান্ড।

লন্ডনভিত্তিক আরবিসি’র সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ক্যাথাল কেনেডি বলেন, ২০২২ সালের ফাইনালের হতাশা কাটিয়ে এবার ফ্রান্স আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। পিএসজি এবং রিয়াল মাদ্রিদের একঝাঁক তারকাদের নিয়ে গড়া এই ফরাসি দলটিতে অভিজ্ঞ ও তরুণদের দারুণ ভারসাম্য রয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এবার টুর্নামেন্টে তারা সম্পূর্ণ সতেজ এক কিলিয়ান এমবাপেকে দলে পাচ্ছে।

mbappe
এমবাপের গোল্ডেন বুট ও ক্লোসের রেকর্ডের হাতছানি: 
রিয়াল মাদ্রিদে দুর্দান্ত একটি মৌসুম শেষ করা কিলিয়ান এমবাপেই অর্থনীতিবিদদের চোখে আসর সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ এবং সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘গোল্ডেন বুট’ পাওয়ার প্রধান দাবিদার। এই দৌড়ে এমবাপের প্রতিদ্বন্দ্বী বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৬১ গোল করে ইউরোপীয় গোল্ডেন শু জেতা ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন।

গোলবন্যার এই আসরে ব্যক্তিগত এক বড় মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমবাপে, কেন এবং লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপে এমবাপের গোল এখন পর্যন্ত ১২টি, মেসির ১৩টি এবং হ্যারি কেনের ৮টি। তাঁরা সবাই এবার জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের করা বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের বিশ্বরেকর্ডটি ভাঙার দৌড়ে শামিল হবেন।

হতাশার বৃত্তে ব্রাজিল, চমক দেখাতে পারে নরওয়ে: অর্থনীতিবিদদের এই পোল বা জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ মানুষই কোনো গাণিতিক মডেল না মেনে নিজেদের ‘অন্তর্যাত্রা’ বা মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতির ওপর ভরসা করে এই রায় দিয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় ২০ শতাংশ অর্থনীতিবিদ তথ্য ও অর্থনৈতিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে এই হাউস ভিউ বা যৌথ পূর্বাভাস তৈরি করেছেন।

Brazil  07
তবে দল হিসেবে ব্রাজিলের জন্য এই জরিপের ফল অত্যন্ত হতাশাজনক। কার্লো আনচেলত্তির মতো হাই-প্রোফাইল কোচ দলের দায়িত্ব নেওয়া সত্ত্বেও সেলেসাওদের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনীতিবিদ। ২০২২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেওয়া ব্রাজিলকেই তারা এবার টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় ‘ফ্লপ’ দল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ব্রাজিলের পরই হতাশ করার তালিকায় রয়েছে ইংল্যান্ড ও জার্মানি। ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের ওপর ভর করে এবার নরওয়ে সবচেয়ে বড় চমক (আন্ডারডগ) দেখাতে পারে বলে মনে করছেন ২১ শতাংশ অর্থনীতিবিদ, আর ১৫ শতাংশের বাজি জাপানের পক্ষে।

বিশ্বকাপে উদীয়মান তারকা হিসেবে ৪৬টি নামের মধ্যে স্পেনের ১৮ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড লামিন ইয়ামাল শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন। আর সেরা গোলকিপারের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’-এর লড়াইয়ে ফ্রান্সের মাইক মাইনিয়ন, আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবং স্পেনের উনাই সিমন ফেভারিট বিবেচিত হচ্ছেন।

Brazil 02
সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ ও মূল্যস্ফীতির ভয়: 
মাঠের লড়াইয়ের বাইরে এবার আয়োজকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে যোগাযোগ ও লজিস্টিক ব্যবস্থা। লাখ লাখ ফুটবল ভক্ত উত্তর আমেরিকায় জড়ো হতে শুরু করায় খরচাপাতির বিষয়টি ইতিমধ্যেই বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টিকিটের চড়া মূল্য, হোটেল ভাড়া এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত খরচের কারণে ভক্তদের পকেট যে গড়ের চেয়ে অনেক বেশি খালি হবে, তা স্পষ্ট। অনেক সমর্থকই আশঙ্কা করছেন, এটিই হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ।

মজার ব্যাপার হলো, ৬০ শতাংশেরও বেশি অর্থনীতিবিদ রসিকতা করে বলেছেন, ফুটবলের এই মহোৎসবের বিজয়ী কে হবে তা মেলানোর চেয়ে ২০২৬ সালের বিশ্ব মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া অনেক সহজ! তুরস্কের সেকারব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ওজান কান তুর্কমেন যেমনটা বললেন, আমরা অন্তত নিশ্চিতভাবে জানি এই বিশ্বকাপ কবে শেষ হবে (১৯ জুলাই)। কিন্তু বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের শেষ কবে, তা তো কেউ জানে না!