না যুদ্ধ, না শান্তির গোলকধাঁধায় মার্কিন সেনারা‍!

৮ জুন ২০২৬ - ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
 0
না যুদ্ধ, না শান্তির গোলকধাঁধায় মার্কিন সেনারা‍!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর দেখতে দেখতে ১৪টি সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন এমন এক অদ্ভুত ও জটিল মোড় নিয়েছে, যাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধও বলা যাচ্ছে না, আবার শান্তিও বলা চলে না। মার্কিন নৌবাহিনী যখন ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন জাহাজ ও ঘাঁটিগুলোতে মোতায়েন থাকা সেনারা প্রতি দুই-তিন দিন পর পরই ইরানের সাথে রক্তক্ষয়ী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিনিময় করছে।

অন্যদিকে, আমেরিকার মাটিতে পেন্টাগন এখন ফুরিয়ে আসা গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত সচল করতে হিমশিম খাচ্ছে, আর দীর্ঘমেয়াদী সামরিক মোতায়েনের কারণে মার্কিন সেনাদের পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ ও ক্ষোভ দানা বাঁধছে।

Iran War 01
গত এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সাথে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। তবে মাঠের যুদ্ধ এখন এক চরম অচলাবস্থার মধ্যে আটকে গেছে। ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত বন্ধ করে রেখেছে, আর ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও ইরানে পূর্ণ মাত্রায় বোমাবর্ষণ শুরু করবে আমেরিকা।

এই চরম উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের সার্বক্ষণিক ‘লেভেল ১০’ অ্যালার্ট বা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে হচ্ছে। ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইরানের ভেতরের টার্গেটগুলোর তালিকা প্রতিমুহূর্তে আপডেট করা হচ্ছে, যাতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্রই আঘাত হানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, চরম মুহূর্তের জন্য বুক ঠুকে সার্বক্ষণিক এই সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও কঠিন একটি মিশন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক কমান্ডার জোসেফ ভোটেল এই সময়টিকে চরম বিপজ্জনক এক অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল গর্ব প্রকাশ করে বলেছেন, আমাদের সেনাদের সাহস, প্রস্তুতি ও পেশাদারিত্বের কারণেই তারা মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধবাহিনী।

Iran War 06
সেনা ও পরিবারগুলোর ওপর মানসিক আঘাত: 
তিন মাসের এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ৪০০ জন আহত হয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই ইরানি ড্রোনের আঘাতে মারাত্মক মস্তিষ্কের ইনজুরিতে ভুগছেন। ম্যারিল্যান্ডের ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিকেল সেন্টারে এখন আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের পর আবারও যুদ্ধাহত সেনাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।

এমনই এক আহত সেনা, ৩৭ বছর বয়সী মার্কিন আর্মি রিজার্ভের সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস কোরি হিকস জানান, যুদ্ধের শুরুতে কুয়েতে এক ইরানি ড্রোন হামলায় তাঁর সাথে থাকা ৬ জন সহযোদ্ধা নিহত হন। মারাত্মকভাবে আহত হিকসের হৃদস্পন্দন কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধই হয়ে গিয়েছিল।

হিকস বলেন, ড্রোনটি যখন ভবনে আছড়ে পড়ে, তখন আমি শুধু এক বিশাল আগুনের গোল্লা আর তীব্র তাপ অনুভব করেছিলাম। আমার পাশে থাকা ৩৯ বছর বয়সী সার্জেন্ট নিকোল আমোরের সাথে আমি কথা বলছিলাম, সে মাত্র ১০ ফুট দূরে ছিল এবং মারা যায়। এই স্মৃতি আমাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

মাঠের এই সংঘাত মার্কিন সেনাদের পরিবারগুলোর মধ্যেও চরম বিভ্রান্তি ও ভীতি তৈরি করেছে। ইরানি গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত মার্কিন জাহাজ ও বিমান ধ্বংসের দাবি করছে, যা মার্কিন সামরিক বাহিনী অস্বীকার করলেও সেনাদের পরিবারগুলো চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার এক সেনা কর্মকর্তার মা ইয়াদিরা দেসেইন্ত জানান, তিনি তাঁর ছেলের সুরক্ষার কথা ভেবে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রতিশোধের ভয়ে ছেলের নাম প্রকাশ করতে চান না। তিনি বলেন, সেখানে ঠিক কী ঘটছে তা না জানাটা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আমি প্রতিদিন সকালে ওকে 'আই লাভ ইউ' লিখে মেসেজ পাঠাই, মাঝে মাঝে ও উত্তর দেয় 'আই মিস ইউ মম'। ইয়াদিরা ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন।

Iran War 07
জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন ট্রাম্প ও ক্ষয়িষ্ণু অস্ত্রভাণ্ডার: 
চলতি মে মাসে প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোসের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকার মাত্র ২৫ শতাংশ (চার ভাগের এক ভাগ) মানুষ মনে করে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত। অর্থাৎ, এই অপ্রিয় যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায় বড় ধস নামিয়েছে।

যুদ্ধের আরেকটি বড় ধাক্কা লেগেছে আমেরিকার অস্ত্রাগারে। বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী রকেট) ব্যবহারের ফলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতায় বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ স্বীকার করেছেন যে, আমেরিকার এই ক্ষয়িষ্ণু অস্ত্রের মজুদ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। ওয়াশিংটনের স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, "যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এটি কেবল ক্ষেপণাস্ত্রই শেষ করে না, বরং সামরিক সরঞ্জাম এবং মানুষের মানসিক শক্তিকেও পিষে ফেলে।"

হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান বা অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে আলোচনা চললেও, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলোর কারণে কোনো স্থায়ী সমাধান আসছে না। ফলে, মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালুচরে মার্কিন সেনাদের এই ‘না যুদ্ধ না শান্তি’র স্নায়ুক্ষয়ী প্রহর আরও দীর্ঘ হতে যাচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।