বাংলাদেশে কেন মারামারিতে জড়াচ্ছেন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকরা

১৪ জুন ২০২৬ - ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
 0
বাংলাদেশে কেন মারামারিতে জড়াচ্ছেন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকরা

‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে খ্যাত বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা উঠেছে। এই টুর্নামেন্ট শুরুর বেশ আগে থেকেই বাংলাদেশের রাস্তাঘাট হরেক রঙের পতাকায় ছেয়ে গেছে। তবে এসব পতাকার একটিও বাংলাদেশের নয়, সবই বিশ্বকাপ খেলুড়ে বিভিন্ন দেশের।

প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি ফুটবল দুনিয়ার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার পাগলাটে সমর্থকদের আবাসস্থল।

গত মে মাস থেকেই দেশটির ফুটবলপ্রেমীরা বিশাল আকারের ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা টানিয়ে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। আবাসিক এলাকাগুলোর বাইরে দেখা যাচ্ছে লিওনেল মেসির বিশাল কাট-আউট, আর ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকার ক্রীড়াসামগ্রীর বাজারগুলোতে ভিড় জমিয়েছেন সমর্থকেরা। সেখানে মাত্র ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির রেপ্লিকা।

বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বিশেষ কোনও ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবুও এই দুই লাতিন আমেরিকান দেশের প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান। বিশ্বকাপ চলাকালে এই আবেগ অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাঝেও বৈরিতার কারণ হয়।

চলতি মাসের শুরুতে হবিগঞ্জে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। অন্যদিকে শরীয়তপুরের একদল তরুণ ঘোষণা দিয়েছেন, ২০০২ সালের পর থেকে অধরা থাকা বিশ্বকাপ ট্রফি ব্রাজিল আবার জয় না করা পর্যন্ত তারা বিয়ে করবেন না।

যদিও ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাই বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু, তবুও অন্যান্য বিশ্বকাপ অংশগ্রহণকারী দেশও মাঝে মাঝে মানুষের আগ্রহ কেড়ে নেয়। ৭২ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন যেমন এ সপ্তাহে সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা প্রদর্শন করে আলোচনায় আসেন নিজের তৈরি করে আলোচনায় আসেন। এ পতাকা তৈরির অর্থ জোগাড় করতে তিনি নিজের জমি বিক্রি করেছিলেন।

প্রায় ২৮ বছর পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া আরলিং হালান্ডদের নরওয়েও বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকরা যেন তাদের ম্যাচগুলোতে ‘ভাইকিংস’দের সমর্থন করেন।

সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় ঢাকাস্থ নরওয়ে দূতাবাস দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে জানায়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া প্রথমদিকের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম নরওয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দূতাবাসটি লিখেছে, ‘তাহলে বলুন বাংলাদেশ, কী সিদ্ধান্ত আপনার? এবার আন্ডারডগদের পক্ষে দাঁড়ানোর সময়। একসঙ্গে বড় স্বপ্ন দেখার সময়।’

বাংলাদেশের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ২০২২ সালে ফিফা ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। নিজ দেশ থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের এমন সমর্থনে তারা বিস্মিত ও আপ্লুত হয়েছিলেন। আর আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের এই ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা।

উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের রাজধানী কলকাতায় ফুটবল খেলার প্রচলন ঘটায়। ষাট ও সত্তরের দশকে যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন হতাশ তরুণেরা খুঁজছিলেন আশার আলো ও অনুপ্রেরণার নায়ক।

সেই সময়ের তরুণরা তাদের অনুপ্রেরণা খুঁজে পান ব্রাজিল দলে, যা ছিল তাদের প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবল শক্তি। পেলে হয়ে ওঠেন জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় এক নাম, যিনি বাংলাদেশের একাধিক প্রজন্মের ফুটবল খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছেন।

এরপর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশে টেলিভিশনের প্রসার ঘটলে ক্রিকেটপ্রেমী এই দেশেও ফুটবলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক বাংলাদেশির জন্য ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল প্রথমবারের মতো রঙিন টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা। সেই আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার কিংবদন্তিতুল্য গোলগুলো ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতীকী বিজয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।

তরুণ প্রজন্মের কাছে ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করেছেন আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকদের প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছেন নেইমার।

এই উন্মাদনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা অতীতেও সহিংস রূপ নিয়েছে—কখনও কখনও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের সর্বশেষ বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে ২৩ জনের প্রাণহানি হয়।

টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে বৈদ্যুতিক তারে পতাকা টাঙাতে গিয়ে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক ১২ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়। একই বছর প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মিছিলে সংঘর্ষের ঘটনায় এক ব্যক্তি ও তার ছেলে গুরুতর আহত হন।