হত্যার পর মরদেহ নিশ্চিহ্ন করা কী খুনির সাজা এড়ানোর কৌশল?

২৪ মে ২০২৬ - ১৭:৫৭ অপরাহ্ণ
 0
হত্যার পর মরদেহ নিশ্চিহ্ন করা কী খুনির সাজা এড়ানোর কৌশল?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নৃশংস অপরাধের মধ্যে ভয়াবহতম হচ্ছে মানুষ হত্যা। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে হত্যার পরও নিষ্ঠুরতা থামে না; বরং আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার (২৪ মে) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা। এর আগে মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিশু রামিসা ঘর থেকে বের হলে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল জোরপূর্বক তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে বাথরুমে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে। এতে শিশু রামিসা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এর মধ্যেই তার মা রামিসার খোঁজে তাদের দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন।

ওই সময় সোহেল রানা ছোট্ট রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করেন। এরপর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে তার মাথা কেটে শরীর থেকে আলাদা করেন। সেই সঙ্গে দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে রক্তাক্ত দেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। একই সময় শিশুটির সংবেদনশীল অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয়। ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী একই রুমে ছিল।  জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে গেলেও পরে গ্রেপ্তার হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ড সেই নির্মম বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে। খুনের পর মরদেহ গোপন ও ধ্বংসের চেষ্টায় যে নিষ্ঠুরতা দেখা গেছে, তা কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং খুনির মানসিকতার গভীর অন্ধকারকে উন্মোচন করে।

এই মানবিক বিপর্যয় মনে করিয়ে দেয়, এমন হত্যাকাণ্ড কখনো শুধু আইনি ঘটনা নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং মানবতার ওপর গভীর আঘাত।

প্রশ্নটি তাই আরও গভীর হয়ে ওঠে-খুনি কেন মরদেহ নিশ্চিহ্ন করতে চায়?

প্রথমত, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা এড়াতে এটি খুনির একটি কৌশল হতে পারে। মৃতদেহই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তাই অনেক অপরাধী মনে করে থাকেন, দেহ না থাকলে তদন্ত দুর্বল হবে, বিচার বিলম্বিত হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে গেলে এরা নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে থাকে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন-সেই হত্যাকাণ্ডের কিছুই তিনি জানেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানের ফরেনসিক প্রযুক্তি ও পরিস্থিতিগত প্রমাণ অনেক ক্ষেত্রেই এই কূটকৌশলকে ভেঙে দিতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে এটি কেবল কৌশল নয়।

অনেক সময় মরদেহের ওপর নৃশংসতা একটি গভীর মানসিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। খুনি তখন শুধু মানুষটিকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় না; সে চায় সেই মানুষটির অস্তিত্ব, পরিচয় এবং স্মৃতিচিহ্ণ-সবকিছু একসঙ্গে মুছে ফেলতে।

এই প্রবণতা আমরা বাংলাদেশে আগেও দেখেছি। দেশের অপরাধ ইতিহাসে ভয়ংকর খুনি এরশাদ সিকদারের ঘটনাও স্মরণীয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি হত্যার পর মরদেহ ইটভাটায় পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করতেন, যাতে হত্যাকাণ্ডের কোন প্রমাণ না থাকে। আবার পাথর বেঁধে লাশ নদীতে ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনাও এ দেশে বহুবার ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলায় নদীতে লাশ ফেলে দেয়ার ঘটনা একই দিকে ইঙ্গিত করে।

সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হক আনার হত্যাকাণ্ডের পর তার মরদেহ টুকরা টুকরা করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ লোপাটের একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা হিসেবেই দেখা হয়। আবার জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় গুরুতর আহত একজনসহ ছয়জনের দেহ পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটি এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে-কেন মৃত্যু নিশ্চিত করার পরও দেহ ধ্বংসের প্রয়োজন পড়ে?

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই চিত্র নতুন নয়। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগজি হত্যাকাণ্ডে তার মরদেহ আজও উদ্ধার হয়নি। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে প্রবেশ করার পর আর জীবিত বের হননি। তদন্তকারীদের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর তার দেহ সম্পূর্ণভাবে গলিয়ে ফেলা হয়েছে। একইভাবে ইউরোপ ও আমেরিকার একাধিক 'নো-বডি' হত্যাকাণ্ডে দেখা গেছে-খুনিরা মরদেহ গোপন বা ধ্বংস করে বিচার ও সাজা এড়াতে চেয়েছে। 

তাই এই প্রবণতা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একাধিক গবেষণাও একই ইঙ্গিত দেয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সায়েন্স ডিরেক্ট জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়— যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ৭৪৩টি হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মরদেহ ফেলার স্থান ও পদ্ধতিতে এক ধরনের মিল রয়েছে যা খুনির সঙ্গে ভিকটিমের সম্পর্কের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে মরদেহ সাধারণত ঘটনাস্থলের কাছাকাছি রাখা হয় এবং প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা বেশি থাকে, আর অপরিচিতদের ক্ষেত্রে দেহ দূরবর্তী স্থানে সরিয়ে নেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়, মরদেহ গুম করা কেবল কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি হত্যাকারীর মানসিকতা ও সম্পর্কগত বাস্তবতার প্রতিফলন।

মরদেহ গুম করা অনেক সময় অপরাধীর পরিকল্পিত কৌশল হলেও, এর ভেতরে প্রায়ই একটি ‘ইরেইজার সাইকোলজি’ কাজ করে। অর্থাৎ ভিকটিমের নিথর দেহ ও অস্তিত্ব সম্পূর্ণ মুছে ফেলার মানসিকতা।

অন্যদিকে, আইনের দৃষ্টিতে মরদেহ না থাকলেও হত্যা প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এটি তদন্তকে কঠিন করে তোলে, আর সেই সুযোগটাই নিতে চায় অপরাধীরা। কিছু ক্ষেত্রে আবার দেখা গেছে মরদেহ খুঁজে না পাওয়ায় তদন্ত জটিল হয়ে পড়ে। এমনকি বিরল কিছু ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত ধরে মামলা এগিয়েছে, পরে তিনি জীবিত ফিরে এসেছেন। এই বাস্তবতা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।

সবকিছু মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, মরদেহ নিশ্চিহ্ন করা কেবল একটি অপরাধমূলক পদক্ষেপ নয়; এটি একটি মানসিক ও প্রতীকী বার্তা। খুনি তখন শুধু একজন মানুষকে হত্যা করে না; তিনি চেষ্টা করেন হত্যাকাণ্ডের মূল প্রমাণ এবং আলামত একসঙ্গে মুছে ফেলতে।