ইরানের সঙ্গে গোপন চুক্তিতে জ্বালানি আনছে ইরাক-পাকিস্তান
পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার অবস্থান থেকে সরে এসে ইরান এখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বা 'কন্ট্রোল করিডোর' প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে। এই নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে ইরাক ও পাকিস্তান সরাসরি তেহরানের সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে জ্বালানি তেল ও এলএনজি পরিবহন শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালী এখন আর কোনো নিরপেক্ষ নৌপথ নয়, বরং এটি ইরানের একটি নিয়ন্ত্রিত করিডোরে পরিণত হয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরাক ও পাকিস্তান তাদের ডুবন্ত অর্থনীতি এবং তীব্র জ্বালানি সংকট সামাল দিতে ইরানের সাথে বিশেষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে। এই চুক্তির ফলে মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ শুরু হয়েছে, যা মূলত এই জলপথে ইরানের পূর্ণ আধিপত্যেরই প্রমাণ দিচ্ছে।

ইরাকের বাজেটের ৯৫ শতাংশই আসে তেলের রাজস্ব থেকে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় দেশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বাগদাদ ও তেহরানের মধ্যকার একটি অঘোষিত চুক্তির মাধ্যমে গত রবিবার দুটি বিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার (প্রতিটিতে প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল তেল রয়েছে) নিরাপদভাবে এই প্রণালী পার হয়েছে। ইরাকি তেল মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এখন আরও বেশি জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের অনুমতির অপেক্ষা করছেন। কারণ ইরাকের অর্থনীতি ভেঙে পড়লে তা ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাওয়া পাকিস্তানও ইরানের সাথে সমজাতীয় চুক্তি করেছে। এই চুক্তির আওতায় কাতার থেকে আসা দুটি এলএনজি ট্যাঙ্কার বর্তমানে পাকিস্তানের পথে রয়েছে। জানা গেছে, কাতার এই চুক্তিতে সরাসরি জড়িত না থাকলেও শিপমেন্ট পাঠানোর আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিষয়টি অবহিত করেছে। এর ফলে যুদ্ধের কারণে থমকে যাওয়া পাকিস্তানের জ্বালানি আমদানিতে কিছুটা গতি ফিরছে।

অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের মতে, ইরান এখন আর হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখতে চায় না, বরং কার জাহাজ যাবে আর কার জাহাজ যাবে না, সেই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে। এই নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করতে ইরান প্রতিটি জাহাজের মালিকানা, গন্তব্য এবং কার্গো স্পেসিফিকেশনসহ যাবতীয় নথিপত্র দাবি করছে। বিশেষ করে ইরাকি তেল মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি ট্যাঙ্কারের বিস্তারিত তথ্য ইরানি নৌবাহিনীর কাছে জমা দিতে হচ্ছে, যাতে ইরানি জলসীমায় কোনো ‘দুর্ঘটনা’ না ঘটে।
যুদ্ধের আগে প্রতি মাসে প্রায় ৩,০০০ জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করলেও বর্তমানে তা মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং এলএনজির দাম বেড়েছে প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি বিভিন্ন দেশ একে একে ইরানের সাথে এভাবে আলাদা চুক্তি করতে শুরু করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই জলপথের ওপর ইরানের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হবে।

এদিকে সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইরান ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানালেও ট্রাম্প সেই দাবিগুলোকে ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের আশা আপাতত ক্ষীণ। ইরান বর্তমানে তার সামরিক শক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে হরমুজ প্রণালীকে বিশ্ব রাজনীতির এক শক্তিশালী দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যার সাক্ষী হচ্ছে ইরাক ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো।