ইরানের ওপর সৌদি আরবের গোপন পাল্টা হামলা

১৩ মে ২০২৬ - ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
 0
ইরানের ওপর সৌদি আরবের গোপন পাল্টা হামলা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর এবার, সৌদি আরবও তাদের ভূখণ্ডে হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরানের ওপর বেশ কিছু অঘোষিত পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমা ও ইরানি কর্মকর্তারা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে চালানো এই অভিযানগুলোর খবর আগে প্রকাশিত হয়নি। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সৌদি আরব সরাসরি ইরানের মাটিতে সামরিক পদক্ষেপ নিলো, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে রিয়াদ কতটা কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে তারই ইঙ্গিত বহন করে।

পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি বিমান বাহিনী গত মার্চের শেষের দিকে ইরানের অভ্যন্তরে এই হামলাগুলো চালায়। একে মূলত 'ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়' এমন এক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান গত কয়েক মাসে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছিল, যার পাল্টা জবাব হিসেবেই এই গোপনীয় সামরিক অভিযান।

Saudi Arab Attack
নির্ভরশীলতা থেকে আত্মরক্ষার পথে রিয়াদ: 
ঐতিহ্যগতভাবে সৌদি আরব মার্কিন সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, গত ১০ সপ্তাহের যুদ্ধে দেখা গেছে যে ইরানের আধুনিক ড্রোন ও মিসাইল প্রযুক্তি মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয়কেও ভেদ করতে সক্ষম। ফলে ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে না থেকে রিয়াদ নিজেই নিজের সীমান্ত রক্ষায় সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে আঘাত হানার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংঘাত যখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল: ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর বিমান হামলা শুরু করে, তখন থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে ইরান বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর অন্তত ১০০ বার হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে বেসামরিক বিমানবন্দর এবং তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তবে আমিরাত যতটা কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সৌদি আরব ততটাই কূটনীতির পথ খোলা রাখতে চেয়েছে।

Saudi Arab Attack
গোপন হামলা ও পরবর্তী সমঝোতা: 
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, হামলার পরপরই সৌদি আরব কূটনৈতিক মাধ্যমে ইরানকে এই প্রতিশোধের বিষয়টি জানিয়ে দেয় এবং হুঁশিয়ারি দেয় যে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। এই হুমকির পরই দুই দেশ একটি অঘোষিত সমঝোতায় পৌঁছাতে সম্মত হয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ আলী ওয়ায়েজের মতে, এটি কোনো বিশ্বাসের জায়গা থেকে নয়, বরং উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছে যে সংঘাত অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়লে দুই দেশেরই অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

শান্তি ও অস্থিরতার দোলাচল: সৌদি আরবের প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল এক নিবন্ধে জানিয়েছেন, ইরান যখন সৌদি আরবকে ধ্বংসের চুল্লিতে টেনে আনতে চেয়েছিল, তখন আমাদের নেতৃত্ব অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে এবং জনগণের জানমাল রক্ষায় সব ব্যবস্থা নিয়েছে।

Saudi Arab Attack
মার্চের শেষ দিকে হামলার তীব্রতা থাকলেও এপ্রিলের শুরুতে তা নাটকীয়ভাবে কমে আসে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে সৌদি আরবে ১০৫টি হামলা হলেও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তা ২৫-এ নেমে আসে। তবে সরাসরি হামলা কমালেও ইরাক থেকে ইরান-পন্থী গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবে প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছিল, যা নিয়ে ইরাকি রাষ্ট্রদূতকে তলবও করেছে রিয়াদ।

৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঠিক এক সপ্তাহ আগে সৌদি-ইরান এই অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা প্রশমনের সমঝোতা কার্যকর হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি পর্দার আড়ালে চললেও সৌদি আরবের এই সরাসরি পাল্টা হামলা এটিই প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং রিয়াদ এখন যে কোনো আগ্রাসনের সরাসরি জবাব দিতে প্রস্তুত।