এক রিটেই পতন দেখলেন শেখ হাসিনা

৫ আগস্ট ২০২৫ - ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ
 0
এক রিটেই পতন দেখলেন শেখ হাসিনা

২০১৮ সাল। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির সব কোটা বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করে। তিন বছর পর ২০২১ সালে ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। রিটের পর হাইকোর্ট রুল জারি করেন।

আরও তিন বছর পর, ২০২৪ সালের ৫ জুন সেই রুলের ভিত্তিতে দেয়া হাইকোর্টের রায়ে এক ঐতিহাসিক ঘটনার সূচনা হয়। রায় প্রকাশের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়, যা মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে শেষ হয়। ৫ আগস্ট, দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। ৮ আগস্ট, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার।

ঘটনার সূচনাপর্ব

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির সব কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে।

২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। একই বছরের ৭ ডিসেম্বর, হাইকোর্ট ওই রিটে রুল জারি করেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ জুন, বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের (বর্তমানে অপসারিত) হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। সেই রায়ে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে যত দ্রুত সম্ভব নতুন পরিপত্র জারি করার নির্দেশ দেয়া হয়।

নতুন করে আন্দোলন

এই রায়ের পর জুলাই মাসের শুরু থেকে শিক্ষার্থীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামে। শুরুতে মিছিল, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি থাকলেও পরে ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে দেশব্যাপী অবরোধ শুরু হয়। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে আন্দোলনকারীরা শুরুতে চার দফা দাবিতে আন্দোলন করলেও পরে তা এক দফায় কেন্দ্রীভূত হয়।

তাদের দাবিতে বলা হয়, সব গ্রেডে সব ধরনের অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে আইন পাস করতে হবে।’

আপিল বিভাগে রাষ্ট্র

প্রথম দিকে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে যায়নি। কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার পর ১০ জুলাই, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করে। পরদিন রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশ প্রকাশিত হয় এবং ১৪ জুলাই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও ছাত্রলীগের হামলা

১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি আদালতেই ফয়সালা করতে হবে।’ একই সঙ্গে তার একটি ‘রাজাকার’ সংক্রান্ত বক্তব্য আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। পরদিন ১৫ জুলাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়।

এর জেরে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১৬ জুলাই, সড়ক অবরোধের সময় পুলিশের গুলিতে ও ছাত্রলীগের হামলায় রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ ৬ জন নিহত হন। পারদিনও বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। সরকার সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেয়।

১৭ জুলাই সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সন্ত্রাসীরা এদের মধ্যে ঢুকে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।’

এসয় তিনি দেশজুড়ে সংঘাতের বিচারবিভাগীয় তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরার আহ্বান জানিয়ে আন্দোলনকারীদের বলেন, সেখানে ছাত্রসমাজ ন্যায়বিচার পাবে বলেই তার বিশ্বাস। কিন্তু শেখ হাসিনার এ আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘শাটডাউনের’ ঘোষণা দেয় আন্দোলনকারীরা। তাদের এ কর্মসূচিতে প্রায় অচল হয়ে পড়ে সারা দেশ। এসময় দেশের বিভিন্ন স্থানে নিহত হন ৪১ জন।

সমঝোতার চেষ্টা

১৮ জুলাই দুপুরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা চাইলে, সরকার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। আমরা কোটা সংস্কারের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত।’ তিনি বলেন, ‘সরকার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি ২১ জুলাই এগিয়ে আনা হয়েছে। 

পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গত কয়েক দিনের সংঘাত ও প্রাণহানির সার্বিক ঘটনা তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করতেও প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করা হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী।

ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পরও আন্দোলন থামেনি। এক পর্যায়ে সরকার মোবাইল এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। ফলে ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বাংলাদেশ। ১৮ জুলাইও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এমন প্রেক্ষিতে সেদিন রাত ১২টা থেকে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী নামানো হয়।

আপিল বিভাগের রায়

কারফিউয়ের মধ্যেই ২১ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে কোটা ব্যবস্থার নতুন বিন্যাস ঠিক করে দেন। আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনার সন্তানের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকবে। বাকি ৯৩ শতাংশ পদে নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে। সরকার অবিলম্বে গেজেট জারি করে এই নির্দেশনা কার্যকর করবে।

সেদিন রাষ্ট্রপক্ষে আপিল বিভাগে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। আন্দোলনকারী দুই শিক্ষার্থীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। রিটকারী মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

শুনানিতে কোটা বিষয়ে মতামত দেন এএফ হাসান আরিফ (প্রয়াত), আহসানুল করীম, জেড আই খান পান্না, তানিয়া আমীর, তানজিব উল আলম, সারা হোসেন। এছাড়া আইনজীবী জয়নুল আবেদীন এবং এ এম মাহবুবউদ্দিন খোকন এবং ইউনুছ আলী আকন্দ মতামত দেন।