‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’: ৫১ দফার ইশতেহার দিল বিএনপি

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ - ১২:০৬ অপরাহ্ণ
 0
‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’: ৫১ দফার ইশতেহার দিল বিএনপি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ প্রত্যয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ইশতেহারের মূল স্লোগান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিএনপির এই নির্বাচনী ইশতেহার জনসমক্ষে তুলে ধরেন।

দলটি জানিয়েছে, ইশতেহারটি ৫টি প্রধান অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যেখানে আগামী পাঁচ বছরে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মোট ৫১টি দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি।

বিএনপির এবারের ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’, এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফাকে ভিত্তি করে।

দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘জনগণের দিন’ শুরু হবে। বিএনপি দাবি করেছে, তারা কেবল স্লোগানে নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বিশ্বাস করে। ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হবে— লুটপাট নয় উৎপাদন, ভয় নয় অধিকার এবং বৈষম্য নয় ন্যায্যতা

নির্বাচনী ইশতেহারের ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি

১. ফ্যামিলি কার্ড
প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এই কার্ডের মাধ্যমে মাসিক ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। সহায়তার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

২. কৃষক কার্ড
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হবে। এর আওতায় ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। মৎস্য ও পশুপালন খাতের উদ্যোক্তারাও এই সুবিধা পাবেন।

৩. স্বাস্থ্যসেবা
দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সারা দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এবং মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

৪. শিক্ষা
বাস্তব দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে এবং মিড-ডে মিল (দুপুরের খাবার) চালু করা হবে।

৫. তরুণ ও কর্মসংস্থান
তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

৬. ক্রীড়া
খেলাধুলাকে পেশা ও আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

৭. পরিবেশ ও জলবায়ু
আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন বা পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করা হবে।

৮. ধর্মীয় সম্প্রীতি
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ কার্যক্রম চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে।

৯. ডিজিটাল অর্থনীতি
আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব প্রতিষ্ঠা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।

ইশতেহারের ৫টি প্রধান অধ্যায়

১. রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন

এই অধ্যায়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সাংবিধানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২. সামাজিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসন

দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং শ্রমিক কল্যাণ এই অধ্যায়ের মূল বিষয়। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কথা বলা হয়েছে।

৩. ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও ট্রিলিয়ন ডলার লক্ষ্য

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় অর্থনীতির পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। বিএনপি বলছে, তারা অর্থনীতির ‘গণতন্ত্রায়ণ’ করবে এবং দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেবে। বিনিয়োগ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

৪. অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ণ

আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল, হাওর-বাওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ঢাকাকে নিরাপদ ও টেকসই মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

৫. ধর্ম, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম

এই অধ্যায়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা, পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, ক্রীড়া, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি জানিয়েছে, এই ইশতেহার শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’। দলটি প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করে ন্যায়, মানবিকতা ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করেছে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সভাপতিত্ব করেন। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। এতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।