বান্দরবানে বন্যায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত, ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ১২ হাজার পরিবার

১৪ জুলাই ২০২৬ - ০৮:৪২ পূর্বাহ্ণ
 0
বান্দরবানে বন্যায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত, ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ১২ হাজার পরিবার

টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতায় পার্বত্য জেলা বান্দরবানের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ পরিবার। জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে বর্তমানে ২ হাজার ৫৮২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্যোগে লামা উপজেলায় পাহাড়ধসে ৫ জন এবং পানিতে ডুবে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত বন্যা পরিস্থিতি বিষয়ক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস।

সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক জানান, ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ২ মিলিমিটার। বর্তমানে বৃষ্টিপাত কমে আসায় নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, সাংগু নদীর পানি বিপৎসীমার ৫ দশমিক ৪৮ মিটার নিচে এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৩ দশমিক ৭১ মিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এখনও সময় লাগবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, চলমান দুর্যোগে জেলার বিভিন্ন স্থানে মোট ৪৭টি ভূমিধস হয়েছে, যার মধ্যে ১১টি বড় আকারের। পাহাড়ধস ও গাছ পড়ে ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সেগুলো সচল করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৬১ কিলোমিটার এবং এলজিইডির ৯০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৪টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি সচল করা হয়েছে এবং বাকি তিনটির সংস্কার কাজ চলছে।

কৃষি খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

ত্রাণ কার্যক্রম প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ টন চাল, ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৫৬০ ব্যাগ ত্রাণ, ৮৭৫ প্যাকেট শিশুখাদ্য, ৩ লাখ টাকা নগদ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বান্দরবান পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিদিন দুই বেলা করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ জন দুর্গত মানুষকে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে আরও ৩ হাজার ব্যাগ ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।

তিনি আরও জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, রেড ক্রিসেন্ট, ব্র্যাক, গ্রাউস, ওয়ার্ল্ড ভিশনসহ বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বিজিবি তাদের ক্যাম্পে ১৩০টির বেশি পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে এবং দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা প্রদান করেছে।

পর্যটন পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসক জানান, বন্যার সময় থানচিতে ১৬৭ জন এবং রুমায় ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েন। সর্বশেষ আমিয়াখুমে আটকে পড়া ৪ জন পর্যটককে বিজিবির সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে।

আগামী পরিকল্পনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ দ্রুত নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে পারবেন। প্রত্যাবর্তনের সময় তাদের অন্তত দুই দিনের খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ১ হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং প্রতিটি পরিবারকে ৩ হাজার টাকা গৃহ মেরামত সহায়তা দেয়ার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্যা পরবর্তী পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ এবং স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।