ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক: চরম বিপাকে ভারত

১৩ জানুয়ারি ২০২৬ - ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ
 0
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক: চরম বিপাকে ভারত

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানে চলমান রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে নেয়া এই সিদ্ধান্ত ভারতের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে আলোচনা। মূলত এই শুল্কের জেরে ভারতের ওপর মোট শুল্ক ৭৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং এতে করে চরম বিপাকে পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা যেকোনও দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে চলমান ব্যাপক বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকারের সহিংস অভিযানের প্রেক্ষাপটে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রায় ৬০০ মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলোতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো দেশ, যারা ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ‘এই মুহূর্ত থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনও দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক দেবে। এই আদেশ চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়।’

এই শুল্ক ঘোষণার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও ভাবছেন ট্রাম্প। সোমবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘বিমান হামলার বিষয়টিও সম্ভাব্য অপশনগুলোর ভেতরে রয়েছে’। তবে তিনি জানান, কূটনৈতিক যোগাযোগের পথও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রকাশ্যে যে ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, গোপনে তার সুর ভিন্ন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?

যদিও ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীনকে ধরা হয়, তবু এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের ওপরও। ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরানে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ৪৪ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি রুপি।

ট্রেডিং ইকোনমিকসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাণিজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ছিল জৈব রাসায়নিক পণ্য— যার মূল্য প্রায় ৫১২ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে ফল, বাদাম, সাইট্রাস ফলের খোসা ও তরমুজ— যার মূল্য ৩১১ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার এবং ৮৬ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলারের খনিজ জ্বালানি ও তেলজাত পণ্য।

এর আগে সস্তায় রাশিয়ার তেল কেনায় নয়াদিল্লির ওপর শাস্তি হিসেবে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল। নতুন করে এই ২৫ শতাংশ যুক্ত হলে মোট শুল্কের হার ৭৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনাধীন শুল্ক ছাড়–সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় একটি অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের আইনগত বৈধতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে একটি রায় অপেক্ষমাণ। আদালত যদি তার বিপক্ষে রায় দেন, তাহলে ইরানের অংশীদার দেশগুলোর ওপর দ্রুত শুল্ক আরোপ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বুধবার আদালতের পরবর্তী মতামত দেয়ার দিন নির্ধারিত রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা মুদ্রা সংকট ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে গণবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির নেতৃত্বাধীন ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধেও রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই আন্দোলনই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

সরকার আগেও বিক্ষোভ সামাল দিয়েছে, কিন্তু এবার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে কয়েক লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। মানবাধিকার কর্মীদের সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মানুষ নিহত এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন এবং সহিংস দমন-পীড়ন বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত সপ্তাহে ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত করবে।

রোববার ট্রাম্প জানান, ইরানি নেতৃত্ব আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং একটি বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার প্রশাসন সব ধরনের অপশন বিবেচনায় রাখছে এবং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এদিকে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সত্যিই ইরানে হামলার অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন।