ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক গভীর সংকটে

২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ - ০৯:১৭ পূর্বাহ্ণ
 0
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক গভীর সংকটে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পলাতক শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা বাড়তে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে। 

দুই দেশের হাইকমিশনারদের পাল্টাপাল্টি তলব ছাড়াও দিল্লি, কলকাতা, শিলিগুড়িতে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। এরপর অনিবার্য কারণ উল্লেখ করে সোমবার (২২ ডিসেম্বর) দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে দিয়েছে ঢাকা। পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত ভিসা ও সব ধরনের কনস্যুলার সেবা স্থগিত থাকবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শনিবারের (২০ ডিসেম্বর) ঘটনা দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এদিন দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে হিন্দু চরমপন্থি একটি সংগঠনের সদস্যরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। এই ঘটনার পরদিনই পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়, যখন ঢাকা ও দিল্লি একে অপরের হাইকমিশনারকে তলব করে। 

এই উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার (২২ ডিসেম্বর) সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রে হামলা চালায় হিন্দুত্ববাদী তিনটি সংগঠন। তারা ভিসা কেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিইউডিজিটাল’-এর কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখান। পরে পরিস্থিতির অবনতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে সোমবার বিকেলেই শিলিগুড়ির ভিসা কেন্দ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়।

শিলিগুড়ির ঘটনার পর একই দিনে ‘অনিবার্য কারণ’ উল্লেখ করে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনের ভিসা ও কনস্যুলার সেবা স্থগিতের ঘোষণা দেয় ঢাকা। পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পরবর্তী নোটিশ না দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের ভিসা ও কনস্যুলার কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দিল্লিতে হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং মঙ্গলবার সকালে ভিএইচপির নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক—এই নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

উত্তেজনা শুধু শিলিগুড়ি বা দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কাছেও বিক্ষোভ করেছে কয়েকটি সংগঠন। তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি জানায়। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডকে ভারতীয় পক্ষ ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে একটি বিবৃতি দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনাপ্রবাহ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। ভিসা ও কনস্যুলার সেবা বন্ধ থাকার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের ওপর। একই সঙ্গে কূটনৈতিক স্তরে আস্থার ঘাটতি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উভয় দেশের পক্ষ থেকেই সংযম ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ ছাড়া বিকল্প নেই।