হাঁটুপানি মাড়িয়ে অফিসযাত্রা, বৃষ্টির পানিতে আজও ঢাকা ঢাকার খানাখন্দ

১৩ জুলাই ২০২৬ - ০৮:১৯ পূর্বাহ্ণ
 0
হাঁটুপানি মাড়িয়ে অফিসযাত্রা, বৃষ্টির পানিতে আজও ঢাকা ঢাকার খানাখন্দ

রাতভর বৃষ্টির পর সোমবার (১৩ জুলাই) সকালেও থামেনি বর্ষণ। সপ্তাহের কর্মদিবসের দ্বিতীয় দিনে ঘর থেকে বেরিয়েই জলাবদ্ধতা, যানজট ও গণপরিবহন সংকটের মুখে পড়ে রাজধানীবাসী। প্রধান সড়ক ও অলিগলিসহ ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় জমেছে পানি। কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও পানির গভীরতা আরও বেশি। টানা বৃষ্টিতে নগরজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ অনেকটাই ব্যাহত হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, রোববার (১২ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় ঢাকায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, এ পরিমাণ বৃষ্টি অতিভারী বৃষ্টিপাতের পর্যায়ে পড়ে।

গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। চলতি মৌসুমে একদিনে এটিই ঢাকায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড বলে জানিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ।

আবুল কালাম মল্লিক বলেন, জুলাই স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিপ্রবণ মাস। ফলে এ সময়ে এমন বৃষ্টিপাত একেবারে অস্বাভাবিক নয়। গত ৫ জুলাই থেকে মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি হচ্ছে।

তার মতে, সোমবার বিকেলের পর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। তবে ১৬ জুলাই থেকে আবার বৃষ্টিপাত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জুলাইজুড়েই বৃষ্টির প্রবণতা থাকতে পারে। কোনো এলাকায় মাঝারি, আবার কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

জলাবদ্ধতায় ডুবেছে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা
টানা ভারী বর্ষণের ফলে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমতে শুরু করে। মিরপুর, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, মালিবাগ, বাড্ডা, শাহজাদপুর, রামপুরা, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, পুরান ঢাকা, শান্তিনগর, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, গ্রিনরোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, শুক্রাবাদ, কলাবাগান, কালশী ও উত্তরার বিভিন্ন সড়ক বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। নিচু এলাকার কিছু বাসাবাড়ির নিচতলাতেও পানি ঢোকার খবর পাওয়া গেছে।

বিজয়নগর, কাকরাইল, ফকিরাপুল, শান্তিনগর ও মালিবাগের বিভিন্ন সড়কে সকাল ১০টার মধ্যেই পানি জমে যায়। অনেক এলাকার অলিগলি ডুবে থাকায় বাসিন্দাদের মূল সড়কে পৌঁছাতেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।

জলাবদ্ধতার মধ্যে নগরের বিভিন্ন সড়কে চলমান খোঁড়াখুঁড়ি নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। বৃষ্টির পানিতে কাটা রাস্তা ও খানাখন্দ দেখা না যাওয়ায় পথচারীদের সতর্ক হয়ে চলাচল করতে হয়েছে। এরপরও গর্তে পা পড়ে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

যানজট ও গণপরিবহন সংকটে দুর্ভোগ
সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহনের গতি কমে যায়। বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। একই সঙ্গে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের সংকট দেখা দেয়। অনেক যাত্রীকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে বাসে উঠতে দেখা গেছে। কেউ ছাতা হাতে, আবার কেউ বৃষ্টিতে ভিজেই কর্মস্থলের পথে রওনা হয়েছেন।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আবু ইউসুফ কুড়িলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য মূল সড়কে এসে দীর্ঘ সময় বাস, রিকশা ও সিএনজি খুঁজছিলেন। তিনি বলেন, বৃষ্টির সুযোগে রিকশা ও সিএনজির ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাসের সংখ্যাও কম। অফিসের সময় হয়ে গেলেও যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না।

বিজয়নগরের বাসিন্দা রিয়াদ খানও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, সড়কে এত বেশি পানি জমেছে যে অনেক রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করছে না। নয়াপল্টন এলাকায় বেশ কয়েকটি সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি পানির মধ্যে বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছেন তিনি।

বৃষ্টির কারণে বিপাকে পড়েছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও। বিজয়নগরের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানান, সকালে কাজে বেরিয়ে সড়ক পানিতে তলিয়ে থাকতে দেখেন। পানি পেরিয়ে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্য দিন দুপুরের মধ্যে কাজ শেষ হলেও সোমবার তা সম্ভব হয়নি।

মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করে জীবিকা নির্বাহ করেন আলম সরদার। তিনি জানান, সকাল ৮টার দিকে শাহবাগ থেকে যাত্রী নিয়ে মিরপুর যাওয়ার পথে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ এলাকায় হাঁটুপানি দেখতে পান।

তবে সড়কপথে দুর্ভোগ বাড়লেও মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ফলে অন্য দিনের তুলনায় সচিবালয় ও মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনে যাত্রীর চাপ বেশি দেখা যায়।

স্থগিত পরীক্ষা, বাতিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস
জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও। পানি ও যানজটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয় ও কলেজে পৌঁছাতে পারেনি। পরিস্থিতি বিবেচনায় মিরপুরের মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পূর্বনির্ধারিত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা, দশম শ্রেণির প্রাক্-নির্বাচনী এবং একাদশ শ্রেণির ব্যবহারিক পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকাও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ, উপাচার্য চত্বর, গণিত ভবন, কার্জন হল, পলাশী, প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষক ক্লাব, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও নীলক্ষেত এলাকায় পানি জমে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও শহীদুল্লাহ হলের আশপাশেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

জলাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, বাংলা এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগের ক্লাস বাতিল করা হয়েছে।

পানি সরাতে মাঠে দুই সিটি করপোরেশন
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করার কথা জানিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, রোববার ভোর থেকেই তাদের জরুরি উদ্ধারকারী দল মাঠে রয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য কমলাপুরে দুটি এবং ধোলাইখালে একটি পাম্প চালু করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ওয়াসা, ডিপিডিসি ও তিতাসের বিভিন্ন রাস্তা খননের কারণে তৈরি গর্ত এবং ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগের বিষয়ে নগরবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, জলাবদ্ধতা কমাতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পানি অপসারণে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ওয়াটার পাম্প সচল রাখা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারক করছেন

জলাবদ্ধতা নিরসনের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তিনি দ্রুত পানি সরাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

শফিকুল ইসলাম খান বলেন, নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দলগুলো মাঠে থাকবে। একই সঙ্গে ড্রেন, খাল ও নালায় বর্জ্য না ফেলার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।