গণঅভ্যুত্থানের দিনলিপি: ১১ জুলাই, কর্মসূচিতে হামলা, মুখোমুখি সরকার ও আন্দোলনকারীরা

১১ জুলাই ২০২৬ - ১৫:০৪ অপরাহ্ণ
 0
গণঅভ্যুত্থানের দিনলিপি: ১১ জুলাই, কর্মসূচিতে হামলা, মুখোমুখি সরকার ও আন্দোলনকারীরা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। টানা চতুর্থ দিনের ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, এদিন বিকেল ৩টার পর আন্দোলনকারীরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সেই বাধা উপেক্ষা করে কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। পুলিশের এই হামলার প্রতিবাদে শুক্রবার (১২ জুলাই) সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক কোটা বাতিলের দাবিতে ১ জুলাই শুরু হওয়া আন্দোলনের ১১তম দিন ছিল ২০২৪ সালের ১১ জুলাই, বৃহস্পতিবার।

এদিন সকাল থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, পুলিশ, সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছাত্রলীগ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বাদ দিয়ে আপিল বিভাগের আদেশের পর ক্যাম্পাসে ফিরে যেতে বলা হয়।

এদিন পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘জনদুর্ভোগ’ সৃষ্টি হয়—এমন কর্মসূচি থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত থাকতে হবে। ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির নামে রাস্তায় নামলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা থেকে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে যান শিক্ষার্থীরা। এর আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নেয় পুলিশ।

আন্দোলনকারীরা যাতে শাহবাগ থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের দিকে এগোতে না পারেন, সে জন্য রাস্তায় ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। সেখানে জলকামান ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করে রাখা হয়।

আন্দোলনকারীরা জানান, শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মিছিল শুরু করলে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়, শাহবাগের ব্যারিকেড অতিক্রম করলে পুলিশ ‘অ্যাকশনে’ যাবে। পরে বিকেল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে সেই ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ মেট্রো স্টেশনের নিচে অবস্থান নেন। তখন পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়।

শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীরা ‘পুলিশ দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘ভয় দেখিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘হামলা করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না’, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’ আবার কখনও ‘ভুয়া-ভুয়া’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

এদিন ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফটকের সামনে বিকেল ৪টায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে ১০ শিক্ষার্থী আহত হন।

একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার যেকোনো চেষ্টা মোকাবিলায় সংগঠনটি প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে শাহবাগসহ ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ যান ও জলকামান মোতায়েন করা হয়।

বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী শাহবাগে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যান। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারডেম হাসপাতালের কাছে তাদের ঘিরে ফেলে এবং সামনে অগ্রসর হতে বাধা দেয়। এতে ধস্তাধস্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশের উদ্দেশে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন। শেষ পর্যন্ত তারা শাহবাগ মোড়েই অবস্থান নেন।

এদিকে ঢাকা কলেজ ও ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি দল শাহবাগের দিকে অগ্রসর হলে নিউমার্কেট এলাকায় পুলিশ তাদের আটকে দেয়। সেখানে তারা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও প্রধান ফটকের তালা ভেঙে বের হয়ে শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজার হয়ে মিছিল করেন। পথে একাধিকবার পুলিশ তাদের থামানোর চেষ্টা করলেও তারা এগিয়ে যান।

কুমিল্লায় আনসার ক্যাম্পের কাছে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ শুরু করলে শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ফজলে রাব্বি জানান, আহতদের মধ্যে ছয়জনকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, আর বাকিরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

চট্টগ্রাম শহরেও টাইগারপাস ও ২ নম্বর গেট এলাকায় পৃথক দুই দফা সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হন। ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। সহিংসতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে অবস্থান বজায় রাখেন।

সরকারের পক্ষ থেকে এদিন মিশ্র বার্তা দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, শিক্ষার্থীরা সীমা অতিক্রম করছেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারা পড়াশোনায় ফিরে যাবেন। তিনি তাদের ‘শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান’ বলে উল্লেখ করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সংযমের আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্দোলনকে রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করার কোনো চেষ্টা সরকার সহ্য করবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানায়।

প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানও এ বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের দাবি শুনতে আদালতের দ্বার সবসময় খোলা রয়েছে এবং নির্বাহী বিভাগের পরিবর্তে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার পরামর্শ দেন।

দিনশেষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাজপথ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারে কার্যকর আইনগত উদ্যোগ না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে জুলাইয়ের এই আন্দোলন শুরুর পর প্রথমবারের মতো তারা শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতাই নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তিরও সরাসরি মুখোমুখি হন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল ফটকে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগে যান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল ৪টার দিকে মিছিল নিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নেন এবং সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।

এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনের সামনে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। তাঁদের মধ্যে নয়জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিন আন্দোলনরত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে সাতজন আহত হন। পরে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ২ নম্বর গেটে এসে সড়ক অবরোধ করেন।

সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল ৪টার দিকে ক্যাম্পাসের গোলচত্বর থেকে মিছিল বের করে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। এ সময় শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করলে পাঁচজন আহত হন।

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী রেলপথ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খুলনার জিরো পয়েন্ট, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যশোর-রাজশাহী মহাসড়ক এবং গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া সড়ক অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করেন। এছাড়া পাবনা-ঈশ্বরদী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা।

এদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোটাবিরোধী আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা বাংলা ব্লকেডের নামে মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে।’

এদিন সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে উপাচার্যদের চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে এ চিঠি পাঠানো হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ‘কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলের আন্দোলনে সম্পৃক্ততার বিষয়ে ইঙ্গিত করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অনেকেই তাদের (আন্দোলনকারীদের) ব্যবহার করার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছে। তাদের ষড়যন্ত্রে পা না দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিন। তারা মেধাবী ছেলে, কেন তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে? জানমালের ক্ষতি করলে, অগ্নিসংযোগ করলে, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করলে তো পুলিশ বসে থাকবে না।’

এদিন ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ের মূল অংশ প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়, সরকার চাইলে কোটার হার বা শতাংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করতে পারবে।