এআই মাধ্যমে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে প্রতারণা: গ্রেপ্তার ৩

১৬ জুন ২০২৬ - ১৭:১২ অপরাহ্ণ
 0
এআই মাধ্যমে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে প্রতারণা: গ্রেপ্তার ৩

অফিসে যাওয়ার তাড়া কিংবা দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস—‘আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ বার্তার সঙ্গে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি লিংক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও সম্ভাব্য আইনি ঝামেলার আশঙ্কায় অনেকেই লিংকে প্রবেশ করে জরিমানা পরিশোধের চেষ্টা করেন। আর সেখানেই পাতা ছিল প্রতারণার ফাঁদ।

বিআরটিএর ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি করা ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একাধিক আভিযানিক দল প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মো. রাব্বি শেখ (২৪), তিনি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বাসিন্দা। মো. রিয়াদ হোসেন (৩১), তিনি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বাসিন্দা। মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১), তিনি ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা।

সিআইডি জানায়, প্রথমে খুলনার বটিয়াঘাটায় অভিযান চালিয়ে রাব্বি শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফেনী থেকে রিয়াদ হোসেন এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে সাজ্জাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, এক ভুক্তভোগী তার মোবাইল ফোনে বিআরটিএর নামে ট্রাফিক জরিমানা ও মামলা সংক্রান্ত একটি এসএমএস পান। বার্তায় থাকা লিংকে প্রবেশ করলে তিনি দেখতে পান, তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ করলে জরিমানার পরিমাণ কমে ১ হাজার ৫০০ টাকা হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি জরিমানা পরিশোধের উদ্দেশ্যে একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তার স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্য ও ওটিপি প্রদান করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখতে পান, জরিমানা পরিশোধের পরিবর্তে তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

পরবর্তীতে তিনি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ করেন। একই ধরনের আরও দুটি অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পারে, প্রতারক চক্রটি ভুয়া ট্রাফিক মামলা ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে এসএমএসের মাধ্যমে ফিশিং লিংক পাঠাত এবং ভুক্তভোগীদের ব্যাংক কার্ড, ব্যাংক হিসাব ও ওটিপি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করত।

এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।

তদন্তে জানা যায়, চক্রটি বিআরটিএর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিল রেখে একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে। সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে হওয়ায় অনেকেই সেটিকে আসল মনে করে সেখানে প্রবেশ করতেন। পরে জরিমানা পরিশোধ বা মামলা যাচাইয়ের নামে নিজেদের ব্যাংক কার্ডের তথ্য, ব্যক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য প্রদান করতেন।

চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীদের ওটিপি সংগ্রহ করে তাদের ব্যাংক হিসাব ও কার্ড থেকে অননুমোদিত লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করত। তদন্তে এ পর্যন্ত একই কৌশলে অন্তত ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে সোপর্দের প্রক্রিয়াও চলমান।

জনগণকে এ ধরনের ফিশিং প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো কোনো এসএমএস, লিংক বা অনলাইন পেমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরিচিত বা সন্দেহজনক কোনো ওয়েবসাইটে ব্যাংক কার্ডের তথ্য, পিন নম্বর বা ওটিপি শেয়ার না করার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।