জুলাই শহিদ দিবস আজ, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দিন
আজ ঐতিহাসিক জুলাই শহিদ দিবস। ২০২৪ সালের এই দিনে রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শহিদ হন। একই দিনে চট্টগ্রামে কলেজশিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ অন্তত ছয়জন নিহত হন। আবু সাঈদের আত্মত্যাগই পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেওয়ার অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৬ জুলাই ২০২৪-এ রংপুরের রাজপথে খোলা বন্দুকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে তার সেই নির্ভীক অবস্থান মুহূর্তেই দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, রংপুরের সেই ঘটনা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং ছাত্র আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপ দেয়। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু হওয়া আবু সাঈদের আত্মত্যাগের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া। তার সাহসী অবস্থান নতুন করে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। আন্দোলনের প্রথম শহিদ হিসেবে আবু সাঈদ আজও রাজপথের স্লোগান, দেয়ালচিত্র এবং নতুন প্রজন্মের চেতনায় জীবন্ত এক প্রতীক। তার দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যকে অনেকে স্বাধীনতা, অধিকার ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের চিরন্তন ইশতেহার হিসেবে দেখেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আবু সাঈদের বীরোচিত আত্মত্যাগ বিশেষ করে মধ্যবিত্ত সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তার মৃত্যুর পর ছাত্র বিক্ষোভ দ্রুত গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসে।
শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা, শোক ও কৃতজ্ঞতা জানানো এবং দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে আজ সারাদেশে জুলাই শহিদ দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, "আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আন্দোলনে আহত সেই সব সাহসী তরুণ-তরুণী ও যুবপ্রজন্মকে, যাদের অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করে আজও যন্ত্রণাময় জীবনযাপন করছেন। একই সঙ্গে গভীর সমবেদনা জানাই শহিদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি, যারা আপনজন হারানোর গভীর শোক বুকে ধারণ করেও অসীম ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়ে চলেছেন।"
জুলাই যোদ্ধা ও গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের ত্যাগ ও অবদানও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, "জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপামর জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক আন্দোলন ও অর্জন নয়; এটি ছিল গণতন্ত্রকামী মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা, সাহস ও আত্মত্যাগের ফসল।"
তিনি আরও বলেন, জুলাই শহিদদের আত্মদান স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের শক্তির উৎস এবং সর্বময় ক্ষমতার মালিক জনগণ।
পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, "১৬ জুলাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ। এদিন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, প্রাণঘাতী শক্তির নির্মম প্রয়োগ এবং ভয়ভীতির রাজনীতির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র অথচ অদম্য সাহসী ছাত্র-জনতা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা জাতির বিবেককে জাগ্রত করেছিল।"
তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দুই হাত প্রসারিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শহিদ আবু সাঈদের দৃশ্যটি কেবল একটি মুহূর্ত ছিল না; এটি ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারবঞ্চিত একটি জাতির ভয় জয়ের প্রতীক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "জুলাইয়ের সেই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, লুণ্ঠন, গুম, খুন, দমন-পীড়ন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।"
তিনি বলেন, সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের শক্তিতেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের মর্যাদা, অধিকার এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নতুন করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর বর্তমান সরকার শহিদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যারা শহিদ হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের পথ ধরেই দেশ বর্তমানে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।
তিনি বলেন, "সব নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমেই আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শহিদদের রক্তের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে পারি।"