অসহনীয় যানজটে মানুষের হাটার গতি এখন গাড়ির চেয়ে বেশি

১৮ এপ্রিল ২০২৬ - ০৭:১৭ পূর্বাহ্ণ
 0
অসহনীয় যানজটে মানুষের হাটার গতি এখন গাড়ির চেয়ে বেশি

৪০০ বছরের পুরনো ঢাকা এখন যেন অচল এক শহর। যেখানে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন বেড়েছে মানুষের সংখ্যা, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দুর্ভোগ। এখন এই নগরী যেন চলমান নয়, বরং স্থবির। যেখানে অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে জনজীবনে।

রাজধানীর সড়কে নেমে এলে দেখা যায় এক ভিন্ন বাস্তবতা। গাড়িচালকদের ভাষায়, “সাধারণত এক সপ্তাহ গাড়ি চালালে যে পরিশ্রম হয়, এখন দুই দিন জ্যামে থাকলেই সেই ক্লান্তি চলে আসে।” 

অন্যদিকে নগরবাসীর অভিজ্ঞতা আরও হতাশাজনক—এত জ্যামে বাসে ওঠার সাহস পাই না, হাঁটাই একমাত্র ভরসা।  নাহলে ৫-৬ মিনিটের রাস্তাও ২-৩ ঘণ্টা লেগে যায়।

বছরের পর বছর ধরে নানা উদ্যোগ, আইন আর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও যানজট থেকে মুক্তি পায়নি রাজধানী। ট্রাফিক পুলিশের দাবি, সড়কের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা তিন থেকে চার গুণ বেশি। যদিও তাদের মতে, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি নেই।

অথচ খুব বেশি দুরে নয়, দেড় দশক আগেও অন্তত মানুষ যানবাহনে গন্তব্যে পৌঁছাত। তখন রাজধানীতে গাড়ির গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার, যা এখন নেমে এসেছে পাঁচ কিলোমিটারের নিচে। অর্থাৎ, মানুষের হাঁটার গতিও এখন গাড়ির চেয়ে বেশি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, শুধুমাত্র অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে কোনো শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

গত এক দশকে মৌচাক-মগবাজার, কুড়িল, মেয়র হানিফসহ পাঁচটি ফ্লাইওভার নির্মাণ হয়েছে। মেট্রোরেলের একটি চলছে, বাকি দুটি লাইন নির্মাণাধীন,বিআরটি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সহ অনেক মেগা অবকাঠামো চলছে রাজধানীজুড়ে। এসব প্রকল্পে অন্তত দেড় লক্ষ কোটি টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু যানজটমুক্ত হয়নি ঢাকা।   

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার এই সংকট সমাধানে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে না পারলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে না।

  • কর্মঘণ্টা নষ্টের ক্ষতি- ১৩৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা 
  • জ্বালানি ক্ষতি- ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা 
  • পরিবেশের ক্ষতি- ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা 
  • দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি- ৮ লাখ ২২ হাজার টাকা
  • প্রতিদিন ক্ষতি হয় ১৫২ কোটি ৫৬ লাখ, বছরে ৫৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা))

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট ২০২১ সালে এক গবেষণায় দেখায়, ঢাকার যানজটে জ্বালানি, কর্মঘণ্টা, পরিবেশসহ পাঁচ ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতি বছরে ৫৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। যা এখন ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির হিসাব যোগ করলে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ে।

অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, যখনই উশৃঙ্খল বিশৃঙ্খল রাখবেন সেখানে আপনার লাইসেন্স থাকবে না, রুট পারমিট থাকবে না, ফিটনেস থাকবে না। এইটা সুযোগ হিসেবে ওই গোষ্ঠীটা কিন্তু সেখানে এক্সট্রোশন বা চাঁদা নেয়। তারা কিন্তু চাচ্ছে না যে এটা শৃঙ্খলা আসুক। বর্তমান সরকারের উচিত হবে তিনটা ফিলসফিতে বসে
পড়া। সেটা হচ্ছে একটা হচ্ছে ম্যানেজমেন্ট, এনফোর্সমেন্ট এবং কমিটমেন্ট।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সড়ক নির্ভরতা নয়। ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা নদীগুলোর সাথে খালগুলোর সংযোগ দিতে পারলে সাড়ে চারশো কিলোমিটার নৌপথের নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। এতে সড়কের অন্তত ত্রিশ ভাগ ব্যবহার কমবে। 

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, অবৈধ দখলমুক্ত করে ফুটপাত সচল করার কাজ চলছে, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে কমিউটার ট্রেন চালু করতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।

ঢাকার রাস্তায় প্রতিবছর প্রায় এক হাজার গাড়ি নতুন করে যুক্ত হয় বিআরটিএর অনুমোদন নিয়ে। অথচ ধারণ ক্ষমতার কয়েক গুণ গাড়িতে ইতিমধ্যে স্থবির এই সড়কগুলো। তাই এই সংকট নিরসনে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ দেখতে চায় নগরবাসী—নতুন সরকারের কাছ থেকে।