ঈদযাত্রায় গলার কাঁটা অবৈধ বাজার ও ইউটার্ন, দায়ী ৮ মহাসড়কের ২০৭ স্পট
দেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থার বড় অংশ সড়কের ওপর নির্ভর। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের মহাসড়কগুলোতে বাড়তে শুরু করেছে যানবাহনের চাপ। তবে অতিরিক্ত গাড়ির চাপের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ হাটবাজার ও অপরিকল্পিত বাসস্ট্যান্ড। পুলিশের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের প্রধান আটটি মহাসড়কের অন্তত শতাধিক পয়েন্টে যানজট ও ধীরগতির মূল কারণ হলো সড়কের কোল ঘেঁষে থাকা বাজার, বাসস্ট্যান্ড এবং যত্রতত্র ইউটার্ন।
উদাহরণসরূপ, উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান রুট ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়ক। এই মহাসড়কের পাঁচটি পয়েন্টে বাজার ও ৯টি জায়গায় বাসস্ট্যান্ড আছে। বাসস্ট্যান্ড রয়েছে– চন্দ্রা জেবি টাওয়ার, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, এলেঙ্গা, হাটিকুমরুল মোড়, চারমাথা, মোকামতলা ও চরিয়া সিকার মধ্যপাড়ায়।
অপরদিকে রপ্তানিমুখী পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক প্রধান রুট হিসেবে বিবেচিত। এই মহাসড়কের বাজার ও বাসস্ট্যান্ড আছে ১৯টি পয়েন্টে। এর মধ্যে আছে ঢাকামুখী চিটাগং রোডের মোড়, মোগড়াপাড়া, গৌরীপুর, চান্দিনাবাজার, মাধাইয়াবাজার, কুটুম্বপুর বাজার, ইলিয়টগঞ্জ বাজার, নিমসার বাজার, মিয়াবাজার, চৌদ্দগ্রাম বাজারের ঢাকামুখী লেন, দেবিদ্বার বাজার, বারইয়ারহাট, মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড।
মহাসড়কে যান চলাচলের ধীরগতি ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশ। সেখানেই উঠে আসে এসব তথ্য।
পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাজার ও বাসস্ট্যান্ড সবচেয়ে বেশি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে। সেখানে বাজার আছে ১৭টি ও বাসস্ট্যান্ড পাঁচটি। বাজারের পয়েন্টের মধ্যে আছে ভবানীপুর, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, মাওনা উড়ালসড়ক, বকশীগঞ্জ, কানুরামপুর, কাশীগঞ্জ, পিরিজপুর, সিডস্টোর ও মোসলেমপুর। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে বাজার ১৯টি ও বাসস্ট্যান্ড দুটি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে বাজার আটটি ও বাসস্ট্যান্ড চারটি, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে বাজার ৯টি, বাসস্ট্যান্ড ১০টি, ঢাকা-কক্সবাজার মহাসড়কে বাজার সাতটি ও বাসস্ট্যান্ড সাতটি, যশোর-খুলনা মহাসড়কের পাশে বাজার একটি ও বাসস্ট্যান্ড একটি।
ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কের অন্তত ৫৫ স্থান যানপ্রবণ এলাকা। এই সড়কে যানজটের পেছনে রয়েছে অন্তত ১৬ কারণ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাড়কের ৪৫টি স্থানে কম-বেশি যানজট তৈরি হয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৪৩টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ১৪টি, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ১৪টি, ঢাকা-কক্সবাজার মহাসড়কে ৯টি এবং খুলনা সড়কে ছয়টি স্থানে যানজট তৈরি হয়।
এ ছাড়া, ১৬ কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কের ৫৫ স্থানে যানজট হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫ স্থানে ইউটার্নের কারণে যানজট হয়। এ ছাড়া ১৭ পয়েন্টে মানুষ হেঁটে রাস্তা পারাপার হয়। অতিরিক্ত গাড়ির চাপের কারণে যানজট হচ্ছে ১১ পয়েন্টে। অবশ্য একই স্থানে একাধিক কারণও রয়েছে।
ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল সড়কে বাস বা যে কোনো যানবাহন ছেড়ে যাওয়ার পর চন্দ্রা ফ্লাইওভারের পশ্চিম প্রান্তে তিনটি কারণে যানজটে পড়তে হয়। কারণগুলো হলো– ইউটার্ন, অতিরিক্ত গাড়ির চাপ ও রাস্তায় হেঁটে পথচারী পারাপার। স্কয়ার কাটা নামক স্থানেও এই তিন কারণে যানজট দেখা দেয়। চন্দ্রা জেবি টাওয়ার এলাকায় পাঁচ ধরনের সমস্যা রয়েছে। বাসস্ট্যান্ড, আন্ডারপাস রোড, রাস্তায় পথচারী পারাপার, অতিরিক্ত গাড়ির চাপ ও সড়কসংলগ্ন বাজার স্থাপন। বাজারের আসা-যাওয়ার কারণে মানুষকে হেঁটে রাস্তা পার হতে হয়। যমুনা সেতু টোল প্লাজায় টোল আদায়ে ধীরগতির কারণেও পেছনে গাড়ির চাপ বেড়ে যায়। এ ছাড়া অনেক সময় সেতুর ওপরে গাড়ি বিকল হয়ে গেলে সেটি দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা না করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে যানবাহন।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের নলকা ব্রিজ এলাকায় উল্টোপথে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করেন চালকরা। বগুড়া বাজার ওভারব্রিজের নিচে ঢাকামুখী সড়কের পাশে বাজার রয়েছে। বাজারে জনসমাগমের কারণে গাড়ির গতি কমে যায়। এ ছাড়া হোটেলগুলো থেকে উল্টো পথে গাড়ি যাতায়াত করে নিয়মিত। রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের চরিয়া সিকার মধ্যপাড়া এলাকায় ইউটার্ন থাকার কারণে গাড়ির গতি কমে যাওয়ায় যানজট দেখা দেয়।
অপরদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪৫ স্থানে যানজট তৈরি হয়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর কারণ ১২টি। ঢাকার অন্যতম প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ চিটাগাং রোড এলাকা। সড়কসংলগ্ন বাজার, সড়কে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশার কারণে সেখানে যানজট কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। ঢাকা থেকে এই রুটে গাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর বরাব বাসস্ট্যান্ডে তীব্র জটে পড়তে হয়। মহাসড়কে উন্নয়নমূলক কাজ চলমান থাকায় গাড়ি থেমে থেমে চলে সেখানে। ফলে পেছনে লম্বা সারি পড়ে যায়। তারাব গোলচত্বরেও প্রায় একই সমস্যা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি হয় সড়কসংলগ্ন বাজার ও বাসস্ট্যান্ড এবং ইউটার্নের কারণে। এই সড়কে ১৭ স্থানে বাজার ও বাসস্ট্যান্ড রয়েছে। সাধারণত বাজারে সবসময়ই ভিড় থাকে। ফলে গাড়ির গতি কমাতে বাধ্য হন চালকরা। এ ছাড়া ইউটার্ন রয়েছে ১১ জায়গায়। এসব স্থানে গাড়ি ঘোরানোর সময় পেছনে সারি পড়ে যায়।
সড়ক পথে ঢাকা থেকে সিলেটের দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। এই মহাসড়কে ১০ কারণে ৪৩ স্থানে নিয়মিত যানজট দেখা দেয়। এই রুটে সবচেয়ে বেশি সমস্যা সড়ক ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাজার। ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত ১৯ স্থানে বাজার, দোকান রয়েছে। বাজারে আসা-যাওয়া মানুষ রাস্তায় উঠে যাওয়ায় গাড়ির গতি কমে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া ১৩টি পয়েন্টে সড়ক সংস্কারের কাজ চলমান রয়েছে। ফলে এসব স্থানে সড়ক তুলনামূলক সরু হয়ে গাড়ি এক বা দুই লেনে ধীরগতিতে চলাচল করে।
রূপগঞ্জের বরপা বাসস্ট্যান্ডে এলাকায় যাত্রীবাহী সব বাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। এ ছাড়া যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় পেছনের বাসকে বাধা দিতে সামনের বাস আড়াআড়ি করে দাঁড়ায়। ফলে একটা গাড়ির পেছনে আরেকটি বাস থেমে সারি বড় হয়। রূপগঞ্জের ভূলতা মোড়ে ফুট ওভারব্রিজ না থাকা এবং ফুটপাতে দোকান থাকায় মানুষকে সড়কে হাঁটতে হয়। তখন গাড়ির গতি কমে যায়।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজটের ২১ পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে পুলিশ। হোতপাড়া ওভার ব্রিজের নিচে, ভবানীপুর বাজার, বাঘের বাজার, নতুন বাজার, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, মাওনা ফ্লাইওভার, এমসি বাজার, জৈনা বাজার, জামালপুরের বকশীবাজার ও ময়মনসিংহের নান্দাইল পুরাতন বাসস্ট্যান্ড উল্লেখযোগ্য যানজটের স্পট। এই সড়কে মূলত ১০ কারণে যানজটে ভুগতে হয় মানুষকে। এর মধ্যে সড়কের যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, সড়কের পাশে বাজার গড়ে ওঠা, রাস্তা খানাখন্দ, অতিরিক্ত গাড়ির চাপ ও বিভিন্ন সড়কের সংযোগস্থলের কারণে বেশি যানজট হয়।
সাভারের হেমায়েতপুরে বাসস্ট্যান্ড ও সড়কের পাশে বড় একটি বাজার গড়ে ওঠায় মানুষের সমাগম থাকে সবসময়। ফলে এই সড়কের যানবাহন ঢাকায় প্রবেশ করার সময় এবং ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর সেখানে যানজটের মুখে পড়তে হয়। সেখানকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা দরকার বলে মনে করেন ওই সড়কে চলাচল করা যাত্রীরা।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ১৪ স্থানে যানজট হয়। এই তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সড়কে আটটি কারণে যানজটে পড়তে হয় মানুষকে।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ১৪টি পয়েন্টে যানজটে পড়তে হয় মানুষকে। এর অন্যতম কারণ, সড়কের পাশে বাজার ও বাসস্ট্যান্ড। এ ছাড়া আরও চার কারণে যানজট পোহাতে হয় মানুষকে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ৯ স্থানে চার কারণে যানজট তৈরি হয়। যশোর-খুলনা মহাসড়কে যানজটের কারণ ছয়টি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কের পাশে অপরিকল্পিত বাজার, মহাসড়কে থ্রিহুইলার বা কম গতির যানবাহন চলাচল, অবৈধ পার্কিং, সড়ক সংকীর্ণতা ও হেঁটে রাস্তা পারপারসহ নানা কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়েও এসব মহাসড়কে যান চলাচলে ধীরগতি দেখা যায়। আর উৎসবের সময়, বিশেষ করে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়।
যানজটের নেপথ্যে একাধিক কারণ কাজ করছে। তবে সব রুটেই কিছু সাধারণ কারণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে– সড়কে ইউটার্ন, পথচারীর হেঁটে রাস্তা পারাপার, অতিরিক্ত গাড়ির চাপ, সড়কের পাশে বাজার বসা, সড়কের পাশে বাসস্ট্যান্ড ও যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো।
২০২১ সালের মহাসড়ক আইনে বলা আছে, অনুমোদন ছাড়া মহাসড়কে বাজার, মার্কেট বা যে কোনো স্থায়ী-অস্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। সড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার কিংবা স্থায়ী-অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা দণ্ডনীয় অপরাধ। নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়ক-মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী অবৈধ হাটবাজার, স্থাপনা ও পার্কিং অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও আছে। তবে প্রশাসনের তরফে তেমন কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
এদিকে ২০২৩ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইনের বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে হাট ও বাজার স্থাপন করতে পারে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এর আলোকেই অনেক মহাসড়কের পাশে অনেক জায়গায় বসছে হাটবাজার।